।।২০ জানুয়ারি, ২০১৮।।

,

বকুল ফুলেরা ঝরে যায়, তবুও মাটিতে বিছানো ফুলগুলো তাঁদের স্মৃতি সুবাসটুকু রেখে দেয় অনেকটা সময় পর্যন্ত। কিছু ঝরা বকুলের কথা বলা রয়েছে এই সিনেমাটাতে। Reema Borah তাঁর Bokul(the fragrance) সিনেমাটাতে অনেকগুলো চরিত্র সাজিয়ে একটা আর্থ-সামাজিক, রাজনৈতিক প্রেক্ষিত সাজানোর চেষ্টা করেছেন। যেখানে রক্তিম যে বোম্বে থেকে অনেকদিন পরে তাঁর শহরে ফেরে, আর সেই রাত থেকে তাঁর সামনে উন্মোচিত হয় নতুন একটা শহর, যেটাকে ফেলে সে বোম্বে গেছিলো সে শহরটার সাথে মিল নেই যেন। এই শহরের তিনটে চরিত্র যাঁদের নাম বকুল;  তারা নানাভাবে রক্তিমের নিজের অপরিচিত শহরকে জানার কেন্দ্র হয়ে ওঠে। প্রথম দিনই উচ্চমাধ্যমিক পাশ রিকশা চালক নিজের পরিচয় দেয় বকুল বলে; যে জয় দা অর্থাৎ রক্তিমের শৈশবের গানের শিক্ষকের ছেলে। সেই বকুলের সন্ধানে রক্তিম খুঁজে পায় সন্তানহারা একাকী একজন জেলে যার নামও বকুল, আর এক স্বনির্ভর, স্বাধীনচেতা মা তার নামও বকুল; যাঁদের জীবনগুলো পারিপার্শ্বিকভাবে বলে চলে আসামের বদলে যাওয়া অবস্থাকে। আর রক্তিম খুঁজে পায় না ভূপেন হাজারিকার গান গাওয়া শৈশবের সেই শিক্ষককে, ও তাঁর বকুল নামের ছেলেটিকে। তবে ছবিটি শেষ হয় উজ্জ্বল চোখের সেই রিকশাচালক বকুলের ঝরে যাওয়া লাশটি সহ। আর দর্শকের হৃদয়কে বিঁধে যায় রক্তিমের স্মৃতিতে রাখা জয়দা- র বকুল নামের গানটি।

ঝরে পড়া বকুলদের কথা যখন মন ভারী করে দিয়েছে, সেই মুহূর্তে Debalina র  “Tin Sotyi (In Fact)” যেন এমন কোন একটা বুকের জোর দিয়ে গেলো, মনে হল মৃত্যু নয় বেঁচে থেকে লড়াই করবার যেসব রসদ চারিদিকে আছে সেগুলো খুঁজে নেওয়া জরুরী। সঙ্ঘমিত্রা, আত্রেয়ী দুটি মানুষের সুখী সংসার, তাঁদের সন্তান তাঁদের পাশে থাকে, সন্তানের কাছে কতো সহজ হয়ে ওঠে তাঁদের সম্পর্ক। প্রভাত তাঁর দৈহিক গঠনকে উপেক্ষা করে কীভাবে নিজের জীবনে নিজের মতো সুখী হয়ে ওঠে, তাঁর পরিবার তাঁর পাশে থাকে বিনা প্রশ্নে। অন্যদিকে পৌষালির মায়ের প্রশ্ন-ও নিজের মধ্যেকার চলা দ্বন্দ্ব নিয়ে একটু একটু করে সন্তানের পাশে ঢাল হয়ে ওঠা এবং এই তথাকথিত ভণ্ড সমাজের নিয়মের মধ্যে থেকে মেয়ের অধিকার নিয়ে সরব হয়ে ওঠা এক মাকে আমরা এই ডকুমেন্টরীতে খুঁজে পাই। আর পৌষালির সম্পর্ক বিষয়ে কথোপকথনকালে এক অপূর্ব কথা দর্শকের মনে দাগ কেটে যায়। পৌষালি যখন বলে আমি মনে করি দুটো মেয়ের একসাথে পার্টনারশিপে থাকার থেকে একসাথে লড়াইয়ে থাকা অনেক বেশী জরুরী । দেবলিনার ‘তিন সত্যি’ দেখতে দেখতে অসামান্য ভালোলাগাবোধ মিলে যেমন মনটা ভালো হয়ে যায়। তেমন এ সিনেমা আমাদের নিজেদের প্রশ্ন করতে শিখিয়ে যায়। সিনেমার ফ্রেম এমনভাবে বিনির্মাণ খুব কম দেখেছি আমরা, সেটা মনে হয়। যখন দেবলিনা সিনেমার বাইরের কিছু দর্শক ও তাঁদের সিনেমাটি দেখবার পর যে মনে হওয়াগুলো সেগুলো যখন সিনেমার শেষে তুলে আনেন সেটা এক প্রকার অনবদ্য। আমাদের নিরাপদ র‍্যাডিক্যাল ক্ষেত্রের বাইরে আমরাই কেমন ভাবে ভাবতে পারি, ভাবতে শিখি তাঁর কিছু টুকরো শক্তিশালী ফুটেজ এই সিনেমাটিকে আরও অনেক বেশি শক্তিশালী করে তুলেছে।

পরবর্তী সিনেমাটি Tarun Jain এর; উত্তর প্রদেশের হরিয়ানার একটি গ্রামের ফ্রেম Amma Meri।  বলরাম তাঁর ২৫ বছরের মেয়ের বিবাহ দিতে চায়। যেটা বেশ ব্যয় সাপেক্ষ। অন্যদিকে তাঁর মেয়ের প্রেমের সম্পর্কটি মেনে নেওয়া তাঁর পক্ষে সম্ভব নয়। তাই মেয়েকে সুপাত্রস্থ করবার জন্য বৃদ্ধ মায়ের জমাপুঁজিতে হাতানোর সুযোগ খোঁজে সে। যেদিন শহরে গিয়ে মায়ের সম্পত্তির নমিনি নিজের নামে করিয়ে আসে সেদিনই তাঁর মেয়েটিও বাড়ি থেকে তার প্রেমিকের সাথে পালায়।

 

Nakul Singh Sawhney তাঁর চলচিত্র অভিযানের সূচনা, কাজ ও প্রসার নিয়ে বলেন। দেশের এই সংকটের মুহূর্তে মিডিয়াগুলোর পক্ষপাতিত্ত্ব চাটুকারিতা কীভাবে একটা বর্গের খবরকে অদৃশ্য করে দেয়। সেখানে নতুন বিকল্প প্রচার মাধ্যমের কার্যকারিতা ও প্রয়োজনীয়তার কথা বলেন। তিনি মুজাফফরনগর রায়ট পরবর্তী সময়ে সেখানে তাবুতে বসবাসকারী আশ্রয়হীন মানুষের দুর্দশা ও তাঁদের কথা তুলে ধরেন ‘ মুহাবজা’ তে । অন্য ডকুমেন্টরী ‘সাভিত্রীস সিস্টার্স অ্যাট আজাদি কুচ’ এ দলিত নারীর জাগরণ ও তাঁদের একরোখা লড়াই চিত্রিত হয়। সেখানে যেন অন্য এক ভারত উঠে আসে। সেটা দেখে ভারতমাতার নামে ভণ্ডামির রাজনীতির বিরুদ্ধে বিকল্প লড়াই যে এই মাটিতে শুরু হয়ে গেছে সেই আশ্বাস পাওয়া যায়।  এছাড়াও ছোট ছোট ক্লিপসে ভিম আর্মি তাঁদের মিছিল, জনমত নানান ক্ষেত্রগুলো নিয়ে ‘চলচিত্র অভিযানের’ কার্যকরী সচলতা এই পর্বে আমাদের নতুন কিছু পথের অন্বেষণে উৎসাহ দেয়।

 

1984, When the sun didn’t rise সিনেমাটি Teena kaur Parsricha –র ফ্রেমে উঠে এসেছে একটা আর্কাইভ। যেখানে নৃশংস শিখ হত্যালিলা চলে সরকারী সহায়তাতে তখন একটা বড় অংশের মানুষ খুন হয়েছিল তাঁদের শিখ পরিচিতি প্রকাশক পাগড়ি দেখে। তাই যে মহিলারা তাঁদের স্বামী সন্তানদের হারান সেই মহিলাদের সংখ্যা অগুনিত। Teena kaur তাঁর ডকুমেন্টরিতে দেখানোর চেষ্টা করেছেন সেই মানুষদের পরিবারকে যারা বেঁচে ছিলেন বীভৎসতার ইতিহাস নিয়ে আপনজনেদের হারিয়ে।

এর পরবর্তী সিনেমাটা ছিল এই দিনের শেষ সিনেমা ‘ এক ইনকিলাব অউর আয়া’ ইনকিলাব বারবার ফিরে আসে ফিরে আসবে। চিৎকার করবে ইনকিলাব সময়ের দাবী মেনে। প্রতিবার ইনকিলাব জিতবে তেমন কোন কথা নয়, তবে কোন কোন বার ইনকিলাব সব ক্ষমতার বাঁধন তছনছ করে সোচ্চার হয়ে উঠবে। এমন একটা ইতিহাসকে উমা চক্রবর্তী ডকুমেন্ট করেছেন। যেটা ঐতিহাসিক ডকুমেন্টরিকে পেরিয়ে আমাদের দর্শকদের মননে তীব্র প্রতিক্রিয়া গড়ে তুলতে সক্ষম। লখনউ-এর ফিরিঙ্গী মহলের ইতিহাস সেখানে সুগরাহ ফাতিমা ঊর্দু কবির লেখা, তার বন্দী জীবন মাথার রোগে অবশেষে মৃত্যুর ইনকিলাব আমাদেরকে অসহায় করে দেয়। তবে পরেরবার তার পরবর্তী খাদিজা আনসারীর রাজনৈতিক জীবন তার লড়াই ঝড়ের মতো এতটাই প্রবল ছিল যে সেই ইনকিলাব দীর্ঘস্থায়ী হয়। আমরা এই সিনেমাতে দুটি প্রজন্মের লড়াইকে দেখলাম অনবদ্য রূপে।

উমা চক্রবর্তী জরুরী অবস্থাকালের সেই সময়ের সাথে এই সময়ের একটি তুলনামূলক গুরুত্বপূর্ণ আলোচনার মধ্যে দিয়ে কোলকাতা পঞ্চম পিপলস ফিল্মস ফেস্টিভ্যালের তৃতীয় দিনটি শেষ হয়।

0 replies

Leave a Reply

Want to join the discussion
Feel free to contribute!

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *