।। ১৮ জানুয়ারি, ২০১৮ ।।

,

শীতের কুয়াশামাখা সকাল আপাত দিকে ধূসর। তবে ১৮ তারিখে যোগেশ মাইমের  সকালটা ছিল একটু আলাদা। অসংখ্য কচিকাঁচাদের ভিড় আর কোলাহলে ধূসরতা কেটে যাচ্ছিল, অনেক রঙ আর হাসিমুখের রোদ ঝিলমিল দিনে রামধনু ছাপা হয়েছিল। প্রথম সিনেমাটার নামও printed rainbow ।  Gitanjali Rao -এর এই অ্যানিমেশন সিনেমাটির রঙ ধূসর। এক বৃদ্ধার দৈনন্দিন একাকীত্ব ও তাঁর নিজস্ব রূপকথাদের রঙ নিয়ে এই সিনেমাটি। তাঁর বাস্তব সাদাকালো জীবনে বাক্সে জমানো অসংখ্য দেশলাই প্যাকেটের রঙগুলো রূপক জগত তৈরি করে দেয়। পড়শি আরেকজন নিঃসঙ্গ বয়স্ক ভদ্রলোক তাঁর দেশলাই বাক্সের পুঁজি জমাতে সাহায্য করেন। ১৫ মিনিটের খুব মিঠে অনুভব আর চোখের পানি দিয়ে শেষ হয় অন্যরকম এই সিনেমাটি। যেখানে অন্য দিনের মতোই বৃদ্ধা ও তাঁর বেড়ালটি দেশলাই বাক্সের রূপকথার পৃথিবীতে চিরতরে চলে যান। পড়শি এসে দেখেন তারা এই সাদাকালো একঘেয়ে জগতটা পেরিয়ে  দেশলাই বাক্সের রূপক জগতে গেছেন, সেই ফ্রেমে একটি রামধনু আঁকা গ্রাম।

এমন গ্রাম হয় নাকি ? কেন হয় না ? অবশ্যই হয়! মকর আর কামরু-দের গ্রামটা তো রামধনু রঙের গ্রামের চেয়েও সুন্দর। আর কামরু তাঁদের গ্রামে পাহাড়ের চূড়াতে একলা বাস করা বৃদ্ধা পাগলী দাদিকে ভালোবাসে। মকর আর তাঁর অন্য বন্ধুরাও পাগলী দাদিকে ভালবাসতে শুরু করে। পাগলী দাদির একটা ছোট্ট নাতনি আছে সে সবসময় তাঁর কাছের মানুষটির সঙ্গ দেয়। তাই Batul Mukhtiar  এর Kaphal সিনেমাটিতে পাগলী দাদি নিঃসঙ্গ নয়। বরং এখানে তিনি পাহাড়ের  রক্ষা করেন, তাঁরা প্রজন্মের পর প্রজন্ম পাহাড়কে আগলেছেন রক্ষা করেছেন, আগামীতেও করবেন। আর পাগলী দাদির তৈরি বনফলের আচার গ্রামের পরিযায়ী মানুষকে ঘরে ফেরানোর আশ্বাস দিয়েছে। আর ছবি শেষে দেখা গেছে পাগলীদাদি সহ গ্রামের কিছু পাগলাদাদা ও শিশুরা মিলে একটা রূপকথার বাস্তব জগত তৈরি করেছেন। এই পৃথিবীতে বিশ্বাস আছে বাঁচার নতুন আকাঙ্ক্ষা আছে।

বিশ্বাস আর আকাঙ্ক্ষা কঠিন শব্দ দুটো শৈশবে গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ Ruksana Tabassum এর The Cake Story  সিনেমাতে এই দুটোই দেখা যায়। একটি শিশু তাঁর নদীর মতো চঞ্চলতার সাথে কিছু বিশ্বাসকে কিভাবে অনুসরণ করতে পারে। আর সেই বিশ্বাস কিভাবে তাঁর আকাঙ্ক্ষিত জিনিসটির কাছে পৌঁছে দেয় তা নিয়ে এই সিনেমাটি। আজকাল শহর থেকে বিশ্বাস হারিয়েছে কংক্রিটের ভিড়ে কাঠিন্য, আর রাস্তাতে ভিড় বাড়িয়েছে ব্যক্তিগত যানবাহন। কিন্তু আজও শহরে শিশুরা জন্মায়, বড় হয়, তাঁদের ছোট ছোট বিশ্বাস ধাক্কা খায়, দম আটকায়। তবে  The Cake Story বেশ আশাবাদী একটা সিনেমা।

সিনেমা শেষে রোদ উঠেছে, আকাশে আর শিশুদের মুখে। তারা বেরিয়ে জানাতে থাকে খুব ভালো লেগেছে তাদের জন্য এই সিনেমাগুলো।

 

পঞ্চম কোলকাতা ফিল্ম ফেস্টিভ্যালের পোস্টার প্রকাশিত হল, কস্তূরী, দ্বৈপায়নের পিপলস ফিল্মস সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ বইটি প্রথম প্রকাশ পেল। এই বিকল্প সিনেমা উৎসব সংক্রান্ত কিছু আলোচনা হল। সাথে গোর্খাল্যান্ডের ঘটনা ঘিরে যে রাষ্ট্রীয় হিংসা দেখা যায় গত বছর তাঁর প্রতিবাদে একটি নেপালি ভাষায় অনূদিত গানের ভিডিও Bristrit Kinarko দেখানো হয়।

এর পরবর্তী সিনেমা গোপাল মেনন এর আই অ্যাম হাদিয়া( I am Hadiya )-তে দেখা যায় রাষ্ট্র, তাঁর প্রশাসন ও বিচার ব্যবস্থা দিয়ে কিভাবে নির্ণয় করে দেবে কে কিভাবে বাঁচবে। হাদিয়ার ঘটনাটি এই ‘হিন্দুস্থানের’ কাছে গর্বের না কি লজ্জার জানা নেয়। তবে এটা প্রমাণিত যেকোনো কট্টরপন্থী দেশের সমতুল্য এই দেশটাও যেখানে প্রাপ্ত বয়স্ক এক শিক্ষিত নারীকেও হিংসার সম্মুখীন হতে হয় তাঁর ব্যক্তিগত পছন্দ অপছন্দের জীবন নির্বাচনের জন্য। আর বাবাগিরির চূড়ান্ত প্রহসন সমেত একটি এই সময়ের ডকুমেন্টরী। আর জানা যায় হাদিয়ার ঘটনাটিতে এনআইএ তদন্ত, জাতীয় নিরাপত্তা লঙ্ঘন হচ্ছে কারণ একটি হিন্দু মেয়ে লাভ জিহাদের কারনে মগজধোলাই হয়ে কীভাবে মুসলমান ধর্ম গ্রহণ করছে এটা দেশের নিরাপত্তার ক্ষেত্রে যথেষ্ট চিন্তার, তাই তদন্তের জন্য দেশের বিচার ব্যবস্থা যথেষ্ট তৎপর।

যদিও দেশের যে শিশু বা কিশোর পরমাণু বিদ্যুৎ প্রকল্পের স্বার্থে গুম হয়ে যাচ্ছে, যারা অসুস্থ হয়ে পড়ছে পরমাণু প্রকল্পের ব্যবসায়িক স্বার্থের কারনে সেই ভারত মাতার দেশে বিচার-তদন্ত তখন অন্য স্বার্থ রক্ষা করতে ব্যস্ত। Kudankulam এ বসতি উচ্ছেদ, নিরপরাধ নাগরিকদের উপর নানান চার্জশিটে মামলা দায়ের হয় সেখানে পরমাণু প্রকল্প গড়ে তুলবার স্বার্থে। দেশের স্বার্থে পরমাণু প্রকল্প এই দাবীতে রাষ্ট্র নগ্ন ক্ষমতার প্রদর্শন শুরু করে। বলতে থাকে পরমাণু প্রকল্পে দেশের অর্থনৈতিক আয় বাড়বে তা দেশের অর্থনৈতিক সুরক্ষা আর যদি সেটাতে বাঁধা দেওয়া হয় তবে তা দেশদ্রোহিতার সামিল। জাতীয় সুরক্ষার মধ্যে অর্থনৈতিক সুরক্ষা পড়ে তাই তা ক্ষতিগ্রস্ত করা যাবে না, প্রতিদানে কিছু গ্রাম, মানুষের প্রাণ, বাস্তুতন্ত্র যাক। কিন্তু ভারতমাতাকে জগত সভাতে স্থান দেওয়া এক জরুরী কর্তব্য।

ভারত মাতার সন্তানের প্রাপ্য কি তবে! একটা করে UID ADHAAR এর বকলস! কেবলমাত্র পরিচয়পত্র কি?  Subasri Krishnan এর this or that particular person ডকুমেন্টরীটা কিছু প্রশ্ন রেখে যায়। আমাদের গলার পাট্টা যেটা জবরদস্তি রাষ্ট্র বেঁধে দিচ্ছে সেটা আমাদেরকে কি কি দিতে সক্ষম। প্রান্তিক এলাকাগুলোতে রাষ্ট্র যখন গলা বাজিয়ে বলছে নাগরিক সুরক্ষা রেশনের চাল, সরকারী সাহায্য পেতে হলে পাট্টাটা পড়তেই হবে বাধ্যতামূলকভাবে। আমরা তখন কি করছি বা করতে পারছি!

এই ছবিটির বক্তব্যকে এগিয়ে দিয়েছেন রঞ্জিত সুর। এই আলোচনা থেকে উঠে আসে হাড় হিম করা কিছু বিষয়। প্রশ্ন ওঠে রাষ্ট্রই কি কেবল নজরদারী করছে নাকি নাগরিকের প্রতিটা খুঁটিনাটি সে বাজারকে সঁপে দিচ্ছে। বাজারের স্বার্থে। আরও অনেকগুলো সূক্ষ্ম ভাবনা সহ আলোচনাটি শেষ হলেও থেকে যায় মাথার মধ্যে অসংখ্য প্রশ্ন। যার উত্তর রাষ্ট্র বা ভারতমাতা দেবেন না। আমাদেরকে খুঁজে নিতে হবে।

আমরা খুঁজছি! আমরা কি খুঁজছি? এর পরের ফিকশান সিনেমাটা ছিল Kamal Km এর I.D.  যেখানে একটা অনিচ্ছাকৃত খোঁজ জারী আছে। একটি কাজ করতে করতে মৃত শ্রমিকের ছবি নিয়ে কর্পোরেটে কাজ করতে উৎসাহী এক তরুণী বিভিন্ন বস্তিতে ঘুরে বেড়াচ্ছেন। কারণ তাঁর উপস্থিতিতে তাঁর ঘরে রঙ করবার সময় শ্রমিকটি মারা যান হঠাৎ। চাইলেও এড়িয়ে যাওয়া সম্ভব হয়না ঐ তরুণীর। আন্ধেরি উচ্চবিত্ত ফ্ল্যাট বাড়ি থেকে বস্তির অলিগলি ক্যামেরা তার নিজস্ব প্রকাশ ক্ষমতার জায়গা থেকে বলে চলে আরও আরও অনেক কথা। আর বেওয়ারিশ লাশের ৭৮২/২০১১ একমাত্র আইডি আর তরুণী ফোনে তোলা মৃতর ছবি নিয়ে খোঁজ আমাদেরকে জানায়। আমরা আদতে এক একটি আইডি মাত্র জেটি কাছে থাকলে পরিচয় না থাকলে বেওয়ারিশ। আমাদের চারিপাশ ঘন হয়ে আসে পাট্টা পড়া না পড়া আইডিতে। আমাদের পরিচয় সীমিত হয়। আমরা একএকটি আইডির মধ্যে আবদ্ধ হয়েও চলাফেরা করছি। কেউ কোন প্রশ্ন করছি না। আসলে সব স্বাভাবিক।

তেমনটাই কি? সব কি স্বাভাবিক অজয় টিজির কয়ি চাঁদ ভি নেহি – তে বাইরে সব স্বাভাবিক ভিতরের লড়াইগুলো অন্যরকম। ভিলাই এর কয়লাখনি, দেশের কালো হীরের উৎপাদক অঞ্চল, বাণিজ্যর স্বার্থে গ্রামের পর গ্রাম উচ্ছেদ। প্রতিবাদীদের লোভ দেখিয়ে ভয় দেখিয়ে অনৈতিকভাবে সরিয়ে দেওয়া। এভাবেই তো উন্নয়ন হয়ে এসেছে বন্দুকের নলে, ক্ষমতার স্বার্থে। কিন্তু সব বন্দুকের গুলি এতো শক্তিশালী হয় না। অজয় টিজির সিনেমাতে দেখা যায় এক বৃদ্ধা নিজের বাসভূমি আঁকড়ে পড়ে আছেন। তিনি অনড় তাকে সরানো সম্ভব হয় নি। তাঁর বাড়ির চারিদিকে মাইন, সেগুলো খনন কালে তাকে কোম্পানির লোকেরা কোলে করে তুলে দূরে নিয়ে যায় আবার বাড়ি ফেরত দিয়ে আসতে বাধ্য হয়। এই সিনেমাটা আমাদেরকে অন্য লড়াই এর কথা জানায় যেটা আমাদের কল্পনার থেকেও কঠিন তবে একই সাথে বাস্তবও।

ফিরে যাই একদম শুরুতে শিশুদের সিনেমাতে  কাফল-এ পাগলী দাদী, দাদি পরদাদি কয়েক হাজার বছর ধরে পাহাড় রক্ষা করে আসছেন।  অজয় টিজির কয়ি চাঁদ ভি নেহি তেও দানবের সাথে লড়ে মাটি কামড়ে পড়ে আছেন এক দাদি। উনি কি পাগলী? পাগলী দাদি যে মাথা উঁচু করে জমি, বাস্তুতন্ত্র রক্ষা করেন উনি কি তেমন কেউ! ওনাদের অনুসারি মকর, কামরু ও তাঁদের বন্ধুদের মতো আমরা কি হতে পারবো! আমাদের তো রাষ্ট্র গলায় পাট্টা পড়িয়ে দিতে পেরেছে এখতিয়ার নির্ধারণ করে দিয়েছে। আমরা এই মুহূর্তে হ্যালুসিনেট করতে পারি কেবল ভারতমাতাকে। তবে পাগলী দাদিদের অস্তিত্ব আজও আছে  স্বীকার না করলেও তারা আছেন। এই বিশ্বাসটুকু ফিরিয়ে গতকাল আবার নতুন কিছু সিনেমা দেখবো। যেখানে আরও কিছু বিকল্প সিনেমার হাত ধরে আমরা অন্যান্য লড়াই এর কথা জানতে পারবো।

১৯-২০-২১ এখনো তিনদিন ধরে চলবে বিকল্প এই সিনেমা উৎসব।

1 reply

Leave a Reply

Want to join the discussion?
Feel free to contribute!

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *