।। ১৮ জানুয়ারি, ২০১৯ ।।

,
পিপলস ফিল্ম কালেকটিভের ষষ্ঠ বার্ষিক ফিল্মোৎসবের আজ ছিল দ্বিতীয় দিন। প্রতিদিনকার যে কুশীলবেরা মঞ্চ প্রস্তুত করে দেন তারা যথারীতি যথাসময়ে মঞ্চ প্রস্তুত করে দিয়েছেন। ঠিক ১০টায় শুরু হয়ে যায় আজকের প্রথম ছবি, রীমা সেনগুপ্ত-র বানানো স্বল্পদৈর্ঘ্যের কাহিনিচিত্র, ‘কাউন্টারফিট কুঙ্কু’। অনবদ্য ছবি। ১৫ মিনিটের মধ্যে দর্শক দেখে নেন, আজকের ভারতের একটি প্রধান শহরের সামাজিক পরিসরে একজন একাকী নারী ঠিক কোন অবস্থায় দাঁড়িয়ে আছেন। এটা অবশ্য খুবই পরিচিত একটি বিষয়। কিন্তু রীমার গল্প বলার গুণে তা হয়ে ওঠে অসামান্য। টানটান এই ছবির প্রতিটি দৃশ্যই দর্শকদের এমন ভাবে নাড়িয়ে দেয় যে পিঠ সোজা রাখা ছাড়া আর কোনও উপায় থাকে না। স্মিতা নিকম তাঁর স্বামীকে ছেড়ে বেরিয়ে আসেন, স্বামীর অত্যাচার সহ্য করতে না পেরে। অত্যাচারের খতিয়ানে শুধু মারধোরই নয়, যৌন হেনস্থাও স্থান পায়। বৈবাহিক ধর্ষণ আর উহ্য থাকে না, তাকে অস্বীকার করার সামাজিক ন্যারেটিভ আসলে তার অস্তিত্বকেই জোরালো ভাবে জানান দিয়ে যায়। বাড়ি থেকে বিতাড়িত, কারণ মেয়ে ব্যাচেলারকে রাখা হবে না বলে সোসাইটি সিদ্ধান্ত নিয়েছে। শুরু হয় স্মিতার বাড়ি খোঁজা। আর এই খোঁজার মধ্যে দিয়ে সমাজের পুরুষতান্ত্রিক ভন্ডামির মুখোশ একের পর এক উন্মোচিত হতে থাকে। শেষ পর্যন্ত স্মিতা বাড়ি পান, কিন্তু ডোরবেল তাঁর নিজস্ব যৌন-যাপনে বাধা দিতে বার বার বেজে ওঠে।
পরের ছবি অপূর্বা ভিলারের ‘ভিত্তাল’ (‘দ্য পিরিয়ড অফ ইমপিউরিটি’)। ১২ বছরের মেয়ে সরিতার পিরিয়ড হলে তাকে মন্দিরে ঠাকুরের মূর্তির সামনে যেতে বারণ করা হয়। ঠাকুর মানে গণেশের মুর্তি, যে আসলে সরিতার মানসজগতে তার প্রিয় বন্ধু ‘গণিয়া’। বন্ধুত্বের টানে সরিতা এই পবিত্রতা এবং অপবিত্রতার টানাপোড়েন থেকে বেরিয়ে আসে এবং এই পুরুষতান্ত্রিক ট্যাবুকে নস্যাৎ করে। কেরালায় সবরিমালা মন্দিরে প্রবেশের আন্দোলনের মধ্যে দিয়ে যে ঐতিহাসিক নারী আন্দোলন এই মুহূর্তে রূপ নিচ্ছে, ছোট্ট সরিতার ছোট্ট গল্পটির মধ্যে দিয়ে সেই চলমান ইতিহাসকেও কি ছুঁয়ে যায় এই ছবিটি?
দ্বিতীয় দিনের দ্বিতীয় সেশনে ছিল তথ্যচিত্রের প্রদর্শন। ছোট ও বড় দৈর্ঘ্যের মিলিয়ে পরপর চারটি ডকুমেন্টারি সিনেমা প্রদর্শিত হয়। প্রথমটি প্রমতি আনন্দ নির্মিত, ‘আকাশবাণী’। গুজরাতের কচ্ছ অঞ্চলের প্রান্তিক যাযাবর ‘মীর’ সম্প্রদায়ের মানুষদের নিয়ে তৈরি এই ছবিটি মিথুলালা মীরের পরিবারকে ঘিরে আবর্তিত। তথাকথিত ডিজিট্যাল ইন্ডিয়ার প্রেক্ষিতে একটি যাযাবর কৌমের জীবনযাত্রার চিত্রায়ন আমাদের এই সুনিয়ন্ত্রিত বেঁচে থাকাকে প্রতিনিয়ত বিদ্রূপ করতে করতে চলে। ‘আকাশবাণী’ সম্প্রচারিত খবর এবং প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর ‘মন কী বাত’ মিথুলালা তাঁর একটি ভাঙ্গা রেডিও মারফত শোনেন। খোলা আকাশের নীচে দাঁড়িয়ে শোনেন ‘স্বচ্ছ ভারত শৌচালয়’-এর ঘোষণা, আর কাঠকুটো জড়ো করা যাযাবর উনুনে ফুটোফাঁটা হাঁড়ি চড়িয়ে শুনতে থাকেন ‘উজ্জ্বলা যোজনা’র ‘আকাশবাণী’। ওই রেডিওটিই তাঁর রাষ্ট্রের সাথে একমাত্র সংযোগ-সূত্র।
এর পরের ছবি, ‘ফাইন্ডিং প্রেয়ারস’ নিলয় সমীরণ নন্দীর তৈরি। বলা যায়, তথ্য এবং কাহিনিচিত্রের একটি মিশেল। এ ছবি নিরন্তর হিংসা এবং শান্তির (নিস্ফল) প্রার্থনার মধ্যে এক যাওয়া আসার চেষ্টা। একজন ট্রান্সজেন্ডার শিল্পী, যিনি আসলে সমস্ত ক্ষণ জুড়ে সামাজিক হিংসার লক্ষ্যবস্তু, আমরা তাঁকে দেখি, কীভাবে তিনি শান্তির খোঁজ, প্রার্থনায় রত। এইভাবে সারা পৃথিবী জুড়ে সাধারণ মানুষ ধর্ম নির্বিশেষে ভয়ঙ্কর হিংসার মধ্যেও শান্তির প্রার্থনায় রত। অসাধারণ কিছু দৃশ্যায়ন চোখে পড়ে এই ছবিতে। দূর্গাপুজোর ভাসানের দৃশ্য এবং তার বাজনা। এক বিরক্তিকর অনুভূতি মুহূর্তে পালটে যায়, নৈঃশব্দের সুখানুভূতিতে, একাকী মানুষের একান্তিক প্রার্থনার দৃশ্যে। আবার মুহূর্তে সর্ব অঙ্গ-মন জুড়ে স্নায়ুতে তীব্রতম আঘাত করে রাজস্থানে গেরুয়া হিংসার মুখোমুখি দাঁড়ানো মালদার শ্রমিক আফরাজুলের শেষ প্রার্থনার দৃশ্য, তাঁর প্রাণভিক্ষার নিস্ফল আর্তনাদ। শেষ দৃশ্যে শিল্পীর বিষন্ন মুখে যখন ক্যামেরা স্থির হয়, দর্শকও আঁকড়ে ধরতে চায় প্রার্থনাকে, দাঙ্গা আর হিংসার পৃথিবীতে অলীক শান্তির খোঁজে। এর পরের ছবি ঐশ্বর্য গ্রোভারের মর্মস্পর্শী ছবি ‘মেমোয়ারস অফ সায়রা অ্যান্ড সালিম’ ২০০২ সালের গুজরাতের দাঙ্গার ১৬ বছর পরে নিজেদের বাড়িতে ফিরে আসার স্মৃতি নিয়ে। খুবই সময়োপযোগী প্রদর্শন। যেখানে অক্লান্ত চেষ্টা চলছে এই দাঙ্গাকে ইতিহাস থেকে মুছে দেওয়ার, সেখানে এই ছবি স্পষ্ট করে দেয় যে এত সহজে এই স্মৃতি ভোলানো সম্ভব নয়।
এই পর্বটির শেষ ছবি ‘অ্যান ইঞ্জিনিয়ারড ড্রিম’। হেমন্ত গাবা নির্দেশিত এই ছবি আমাদের সামনে স্পষ্ট করে দেয় ভারতবর্ষে ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজে ভর্তির সুযোগের নামে আসলে ঠিক কী চলছে। এই তথ্যচিত্রটি তোলা হয় রাজস্থানের কোটা শহরের কোচিং সেন্টারগুলিতে। অসাধারণ কিছু দৃশ্যায়নের মাধ্যমে হেমন্ত গাবা দর্শকদের কাছে স্পষ্ট করে তোলেন, শিক্ষার পণ্যায়ন এবং তার ভয়াবহ রূপকে। আইআইটি-তে পড়ার স্বপ্ন বেচে কীভাবে এই কোচিং সেন্টারগুলি ছাত্রছাত্রীদের ওপর নামিয়ে আনছে এক অমানুষিক চাপ আর কদর্য প্রতিযোগিতার অভ্যাস, যার ফলে ছাত্রছাত্রীরা ক্রমশঃ শিকার হচ্ছে ডিপ্রেশনের। ছবিটি আড়াল করে না সেই সব রাজনৈতিক শক্তিগুলিকেও, যারা এই শিক্ষাব্যবসায় ফুলে ফেঁপে কলাগাছ হয়ে উঠছে। ছবির প্রথম দৃশ্যেই দেখা যায়, রাজস্থানের ভূতপূর্ব মুখ্যমন্ত্রী তথা বিজেপি নেত্রী বসুন্ধরা রাজে সিন্ধিয়ার উপস্থিতিতে ধর্মব্যবসায়ী শ্রীশ্রী রবিশংকরের সামনে বিরাট জনসভায় লাখ লাখ ছাত্রের সামনে সাষ্টাঙ্গ প্রণাম সেরে নিচ্ছেন সমস্ত প্রতিযোগী কোচিং সেন্টারের মালিকরা। অনেক ছাত্রছাত্রীই এই ভয়ানক প্রতিযোগিতার চাপ না নিতে পেরে আত্মহত্যা করছে। এই বছরেই কোটা শহরে অন্ততপক্ষে ১৯ জন ছাত্রের আত্মহত্যার খবর আমরা জানি। ছবি শেষ হয়, অল-ইন্ডিয়া র‍্যাঙ্কিং-এ যে ছেলেটি পঞ্চম হয়েছে তার ইন্টারভিউ দিয়ে। ছেলেটির উত্তরগুলি চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয় এই গোটা ব্যবস্থার অন্তঃসারশূন্যতা আর উচ্চশিক্ষার বেসরকারিকরণের বিষময় ফলশ্রুতি। ছবির শেষে দর্শক সঙ্গে করে নিয়ে যান, লক্ষ লক্ষ কিশোরের কৈশোর কেড়ে নেওয়ার এক ভয়ঙ্কর নিদর্শনের দৃশ্য-শ্রাব্য স্মৃতি।
পরবর্তী পর্বে প্রদর্শিত দু’টি ছবি পরিবেশ, বাস্তুতন্ত্র, মানুষ ও না-মানুষের জীবন নিয়ে মৌলিক কিছু প্রশ্ন তোলে। মিথুন চন্দ্রনের ‘পিলান্ডি’ ছবিটা এক নিগুঢ় প্রশ্নের কাছে এনে আমাদের দাঁড় করিয়ে দেয়। কেরালার পালাক্কাড অঞ্চলে একটি হাতি কিছু লোক মেরেছে। বন্য প্রাণীকে খুনি বানানো সহজ। তার হয়ে উকিল কোর্টে যায় না। তাকে বন্দী করা যায় তাড়াতাড়ি। কিন্তু মাটির কাছাকাছি থাকা জঙ্গলবাসী মানুষরা আসল ব্যাপারটা খোলসা করেন। জঙ্গলের লোভে হাতির স্বাভাবিক আবাস, খাদ্য সংস্থান বেদখন হয়ে যাচ্ছে। হাতি বাধ্য হয়ে লোকালয়ে ঢুকছে। এদিকে, জঙ্গলের আরও জমি নিয়ে নিতে বন্য প্রাণীকে খুনি সাজানো দরকার। দাসত্বের আওতায় আনতে তাদের বন্দি করা দরকার। বন্দি হাতিদের ভবিতব্য? ছবির শেষের দৃশ্য সেই ইঙ্গিত দিয়ে যায়, যেখানে আমরা দেখি হাইওয়ে দিয়ে চলেছে গয়নায় সুসজ্জিত ‘মন্দিরের পোষা হাতি’। মিথুনের এই ছবির সৌন্দর্য ওই অঞ্চলের মানুষদের জবানিকে সরাসরি তুলে ধরায়। অপূর্ব সহজ ভাষ্যে তাঁরা বলে চলেন পিলান্ডি নামক হাতিটিকে নিয়ে। কেউ কেউ তাকে দোষি করলেও বেশিরভাগই তার পাশে থাকেন। আসলে বন্য প্রাণীরা আমাদের পথে আসে না। আমরাই তাদের জন্য যে বন তার মধ্যে দিয়ে রাস্তা কাটি, কারখানার ইমারত তৈরি করে বনকে ধ্বংস করি। এই ছবির প্রদর্শনের শেষে দর্শকের সাথে আলোচনায় উঠে আসে সদ্য সদ্য বেআইনি ভাবে গুলি করে মেরে ফেলা বাঘিনী অবনীর প্রসঙ্গ। মুম্বাইয়ের যে বনে অবনীকে ‘মানুষখেকো’ অপবাদ দিয়ে মেরে ফেলা হয়, ক’দিনের মধ্যেই সে বনের মালিকানা তুলে দেওয়া হয় পুঁজিপতি আম্বানীদের হাতে।
আবার বন-জঙ্গলের দোহাই দিয়ে আমাদের পুঁজিপতি-তোষক সরকারগুলো ক্রমাগত গরীব মানুষদের উচ্ছেদ করে। কেতন কৃষ্ণ, পৃথবীর সোলাঙ্কি, সুকৃতা বড়ুয়া, অর্চনা কাওয়ারে ও নিখিল আম্বেকরের ছবি ‘আপরুটেড’ আমাদের দেখায় ম্যানগ্রোভ অরণ্যের কাছে বসবাস নিষিদ্ধ করছে সরকার। গরীব, খেটে খাওয়া, দলিত মানুষকে উচ্ছেদ করছে তাঁদের অনেক কষ্টে গড়ে তোলা বস্তি থেকে। অথচ ওই একই উপকূলবর্তী অরণ্যের লাখে লাখে একর জমি বেসরকারি মাল্টিন্যাশানাল সংস্থা কিনে নিয়ে যখন ম্যানগ্রোভের জঙ্গল কেটে সাফ করছে, তখন সরকার কিছুই বলছে না। অসাধারণ ভাব ও ভাবনার ছবি। আবহ সঙ্গীত খুবই মনোজ্ঞ। প্রদর্শনের শেষে অর্চনা সঞ্চালক ও দর্শকের সাথে কথোপকথনে অংশ নেন।
কলকাতা পিপল্‌স ফিল্ম ফেস্টিভ্যালের ঘোষিত নীতি অনুযায়ী, মূলতঃ রাজনৈতিক ডকুমেন্টারির উৎসব হলেও, ফিকশন সেকশনে অসম্ভব সুন্দর কিছু অন্যধারার কাহিনিচিত্র প্রদর্শিত হয়। অসমের চিত্রনির্মাতা মেহেদি জাহানের ‘জ্যোতি আরু জয়মতী’ এমনই এক ছবি যা সাইলেন্ট সিনেমার স্বপ্নদৃশ্যের ভাষায় পর্দায় আনে অসমের রাজনৈতিক ইতিহাসের নানা অধ্যায়কে। পর্দায় ছবিটি হয়ে ওঠে এমন এক কবিতা যা থেকে বেরনো যায় না। নির্বাক ছবি কিন্তু কত কথা বলে যায়, যা ভাষায় প্রকাশ করা দুরূহ।
পরের ছবিটিও অসম থেকেই। মুকুল হালৈ নির্মিত তথ্যচিত্র ‘টেলস ফ্রম আওয়ার চাইল্ডহুড’। ইউনাইটেড লিবারেশন ফ্রন্ট অফ অসম (আলফা)-র সময়পর্ব, আশি ও নব্বইয়ের দশকে বেড়ে ওঠা প্রজন্মের ছোটবেলার, কিশোরবেলার, যুবকবেলার স্মৃতি নিয়ে পরিচালকের নিজস্ব ইতিহাস ও তাঁর কৌম ইতিহাসের নিবিড় বুনোট। ছবিটি ধীর গতিতে পা ফেলে ফেলে এগোয়। ক্যামেরার অন্যরকম ব্যবহারে, সম্পাদনার অসামান্য ছন্দে, ন্যারেটিভের চলনে, সাবটাইটেল, ভাষ্য, কবিতার ব্যবহারে আর রাজনৈতিক ধারে, এমন মুড পরিচালক তৈরি করেন যা ডকুমেন্টারি ছবিতে সচরাচর দেখা যায় না। ছবিটার পড়ে মুকুল হালৈ-এর সাথে সঞ্চালক ও দর্শকের দীর্ঘ মতবিনিময় হয়।
‘ফ্যাসিবাদী সময়ে তথ্যচিত্র’ এই আলোচনাসভা দিয়ে শুরু হয় সন্ধ্যের পর্ব। পিপল্‌স ফিল্ম কালেকটিভের পক্ষে সঞ্চালনা করেন তৃণা নিলীনা ব্যানার্জী। বিশিষ্ট তথ্যচিত্র নির্মাতা দীপা ধনরাজ আজ ভারতবর্ষের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে ডকুমেন্টারির নতুন ভাষা খুঁজে পাওয়া নিয়ে কিছুটা আশাবাদী আর কিছুটা ভঙ্গুরমনা। তথ্যচিত্র যে রাগ, যে রাজনৈতিক সন্দর্ভ আর যে আগুন বহন করে, একটা সময় জোরের সাথে করত আর বদলে দিতে পারত আলোচনার পরিসর, আজ তাঁর মতে সেই তেজকে ফিরিয়ে আনা প্রয়োজন। একঘন্টার আলোচনায় বারবার সে কথা উঠে এল। কলকাতা পিপল্‌স ফিল্ম ফেস্টিভ্যালের একটি প্রধান আকর্ষণ তার আলোচনা সভা। আজকের আলোচনায় উপস্থিত ছিলেন তথ্যচিত্র নির্মাতা দীপা ধনরাজ, প্রদীপ কে. পি. এবং রণদীপ সিং। সঞ্চালকের প্রশ্নে বহু না-বলা কথা উঠে এল। প্রদীপ বললেন গৌরী লঙ্কেশের কথা। তাঁর বন্ধু, তাঁর সুহৃদ গৌরীর কথা। তাঁর ছবি ‘আওয়ার গৌরী’ ছবির সাবজেক্ট গৌরীর কথা। যে ছবি কোনওদিন বানাতে হবে তিনি স্বপ্নেও ভাবেননি। প্রদীপ কে. পি.-র কথায় উঠে এল, ব্যাঙ্গালোর তথা কর্ণাটকে সঙ্ঘ পরিবারের ফ্যাসিবাদী রাজনীতির বিরুদ্ধে সিনেমাকে হাতিয়ার করে সাংস্কৃতিক লড়াই লড়ার অভিজ্ঞতার কথা। উঠল বিগ মিডিয়া, সোশ্যাল মিডিয়াকে ব্যবহার ও পালটা ব্যবহারের প্রসঙ্গ। রণদীপ সিং পাঞ্জাবের মানুষ। দলিত ক্ষেতমজুর শ্রেণীর প্রতিনিধিত্ব করে তাঁর ছবি। সোশ্যাল মিডিয়ার দৌলতে আজ ছবির পর ছবি, ইমেজের পর ইমেজ তৈরি হলেও তাদের অভিঘাত নিয়ে তিনি সন্দিহান। ক্ষমতার প্রতিপক্ষ হয়ে ইমেজের ব্যবহার নিয়ে বললেন বেশ কিছু মূল্যবান কথা, যা তাঁর অভিজ্ঞতাপ্রসূত। পাঞ্জাবের রাজনৈতিক আবহ সম্বন্ধেও তিনি নতুনভাবে আলোকপাত করলেন।
তু খুদা হ্যায়
খুদা খুদা হ্যায়
খুদা জানে কৌন খুদা হ্যায়!
তু সামহাল কে বৈঠ না হুসনে ল্যায়লা দেখনে ওয়ালো…
তামাশা খুদ না বান জানা তামাশা দেখনে ওয়ালো।
পুরনো দিল্লির এক গভীর রাতের স্বপ্নে আসে মা লক্ষ্মী যে প্রচুর সম্পদ দান করে। হঠাৎই স্বপ্নের মধ্যে লাল পতাকা ঝাপট দেয় ধন-দেবীর গালে। তার পর শুরু হয় ইন্টারন্যাশনাল। সেখানে এক শ্রমিক সংগঠক (লালী) তারাদের আকাশে তারাদের ভিড়ে সেই ঝান্ডা ওড়াচ্ছে। এই একই সময়ে দিল্লির পুরোনো গলির অসংখ্য ফুটপাথবাসী আর বস্তিবাসী মানুষেরা স্বপ্ন দেখে চলে। কেউ স্বপ্নে লাশেদের ভিড় দেখে। কারো স্বপ্নে মিকি মাউস বা পোকেমন এসে লজেন্স দিয়ে যায়। এই অসংখ্য আলাদা আলাদা স্বপ্ন আর মানুষের বাস্তব জীবনযাত্রা এক হয়ে গিয়ে তৈরি হয় এক অনবদ্য আলাদা ধরনের সিনেমা।
আজকের, উৎসবের দ্বিতীয় দিনের শেষ ছবি, অনামিকা হাকসারের কাহিনিচিত্র ‘ঘোড়ে কো জলেবি খিলানে লে যা রিয়া হুঁ’ একটি এমন সিনেমা যা বারবার দেখা যায়, আর প্রতিবার সিনেমা শেষে স্তব্ধ হয়ে যেতে হয়। ঠিক তেমন অনুভূতিই হল কানায় কানায় ভরা প্রেক্ষাগৃহে। নয়া দিল্লির শাহজাহানাবাদ তার অদেখা-অশ্রুত দৃশ্যশ্রাব্য জগত নিয়ে এক অন্য আকাঙ্ক্ষিত দুনিয়ার কথা বলে গেল। শুনিয়ে গেল স্বপ্নের আর স্বপ্নভঙ্গের গল্প। দু’ ঘন্টা ধরে দর্শকদের করে তুলল ওই অন্য কিন্তু বাস্তব জগতের অধিবাসী। ছবির শেষে নির্দেশক অনামিকা হাকসারের সাথে সঞ্চালক ও দর্শকদের দীর্ঘ বাক্যালাপ চলল সেই জের টেনে, যা শেষই হতে চাইছিল না।
0 replies

Leave a Reply

Want to join the discussion
Feel free to contribute!

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *