।। ১৭ জানুয়ারি, ২০১৯ ।।

,

মাঘ মাসের কলকাতা। সোয়েটার, চাদর, লেপ, তোষক, আর বাতাসে নতুন গুড়ের গন্ধ। হাজরার দিক থেকে হেঁটে এলে আরেক রকম গন্ধ পাওয়া যাচ্ছে। সিনেমা উৎসবের গন্ধ। কলকাতা পিপল্‌স ফিল্ম ফেস্টিভ্যাল। রাস্তায় রাস্তায় পোস্টার, ফেস্টুন আর আশাবাদ। যোগেশ মাইম একাডেমীতে ১৭ই জানুয়ারি থেকে ২০শে জানুয়ারি অবধি প্রতিদিন সকাল ৯টা থেকে রাত ১০টা চলছে এই উৎসব। কোনও প্রবেশমূল্য নেই। নেই কোনও সরকারি, বেসরকারি বা কর্পোরেট অনুদান। জনগণের অর্থ সাহায্যে জনগণের সিনেমা উৎসব। জীবনের সিনেমা, প্রতিরোধের সিনেমা নিয়ে। যে সিনেমার মধ্যে দিয়ে ভারত, দক্ষিণ এশিয়া আর বহির্বিশ্বের নানা সামাজিক-রাজনৈতিক বিষয়ের গভীরে প্রবেশ করা যায়, গড়ে তোলা যায় আলোচনা ও বিতর্কের পরিসর। তবেই না প্রতিরোধের ভাষা আরও অনুরণন পাবে!

এই সিনেমা উৎসব ষষ্ঠ বছরে পা দিল। আজকের তোড়জোড় সেই সকাল থেকে শুরু। উৎসব শুরুর আগে এক ঘন্টার মধ্যে বই, ডিভিডির স্টল বসে গেল। এ বছরের স্টলে বহু নতুন বই এসেছে, নানা ধরনের ডকুমেন্টারি সিনেমার ডিভিডিও হাজির। আরেকটি আকর্ষণ – ফেস্টিভ্যালের নামাঙ্কিত ঝোলা-ব্যাগ আর স্লোগান আঁকা টি-শার্ট। সপ্তাহের মাঝখানের একটি দিন হলেও জনসমাগমে কোনও ঘাটতি হয়নি। উদ্বোধনী ছবি পাকিস্তানের। জার্মান তথ্যচিত্রনির্মাতা শকোফে কামিজের নির্দেশনায় নির্মিত ‘আফটার সাবিন’।
ছবিটি কাঁদিয়ে দেয় যেন। সাবিন মাহমুদ পাকিস্তানের করাচীতে একটি সাংস্কৃতিক সংস্থা চালাতেন। পাকিস্তানের প্রায় কুড়ি হাজার সমাজকর্মীর অন্তর্ধান নিয়ে অনুষ্ঠান করেছিলেন। অনেকেই মানা করেছিলেন কিন্তু সাবিন শোনেননি। “কাউকে তো প্রতিবাদ করতেই হবে”, এমনটাই তিনি মনে করেছিলেন। আর তাতেই, ২৪শে এপ্রিল,২০১৫-য় তাঁর গাড়ি ট্রাফিক সিগনালে থামলে দু’জন দুষ্কৃতি গুলি চালায় গাড়িতে বসা তাঁর ও তাঁর মায়ের দিকে। মা বেঁচে গেলেও সাবিনকে আমরা হারাই। কতরকম করে তাঁকে আমরা হারিয়েছি, ক্যামেরায় সেসব কথা বলে চলেন সাবিনের ৬৫ বছরের মা, ৯১ বছরের দিদিমা, সাবিনের বন্ধুরা, তাঁর গ্যালারিতে চাকরি করা ছেলেটি, এমনকি ঘরের বেড়াল ‘জাদু’ পর্যন্ত। মাঝে মাঝে পর্দায় ভেসে ওঠে সাবিনের মৃত্যু নিয়ে সকলে ফেসবুকে কী লিখেছিলেন। অবশ্য সাবিনকে হত্যা করা গেলেও তাঁর আদর্শকে মেরে ফেলা যায় না। আদর্শ সব সময়ই বুলেট-প্রুফ। তা না হলে গৌরী লঙ্কেশ, গোবিন্দ পানসারে, নরেন্দ্র দাভোলকরকেও মেরে ফেলা যেত। সম্ভব হয়েছে কি? তাঁরা সশরীরে না থাকলেও তাঁদের আদর্শ আর কাজের উত্তরাধিকার নিয়ে আজও আমাদের মধ্যেই আছেন। আমরা তা জানি, দেখেওছি। তবু মন কেঁদে ওঠে যখন সাবিনের বন্ধুরা গেয়ে ওঠেন ফৈয়জ আহমেদ ফৈজের লেখা সেই বিখ্যাত গান- “খুন কে ধব্বে ধুলেঙ্গে কিতনে বারিশো কে বাদ…”। শুধু এটুকু নয়, ‘সাবিনের পর’-এ তবে অনেক কিছু রয়ে গেল।
দ্বিতীয় ছবিটিও পাকিস্তানের। নিদা মেহবুব নির্দেশিত তথ্যচিত্র ‘২৯৮-সি’। পাকিস্তানের সংবিধানে একটি অত্যন্ত ন্যক্কারজনক অধ্যায় সেকশন ২৯৮। সেখানে ‘আহমেদিয়া’-দের প্রতি স্পষ্ট বৈষম্য চোখে পড়ে। সংখ্যালঘু সেই শ্রেণীর মানুষদের ওপর যে কী অত্যাচার চলছে বছরের পর বছর তা অভাবনীয়। অথচ সকলে একই কোরান শরীফ মেনে চলেন। বিষয়টি সংবেদনশীল আর গভীর। ছবিটি আরেকটু দীর্ঘ হলে আরও ভেতরে প্রবেশ করা যেত। আহমেদিয়ারা পাকিস্তানে সংখ্যালঘু। যে কোনও দেশেই সংখ্যালঘুরা বৈষম্যের শিকার। অকল্পনীয় অত্যাচারের ছবি যে কোনও সময় সৈনিকদের ক্যামেরাবন্দি হতে পারে। আর, তার পরের ছবি, ইরানের চিত্রপরিচালক মোহম্মদ মাহেদি খালেঘি নির্মিত ‘রোহিঙ্গাস ড্রিম’ দেখে কেঁপে উঠতে হয়, যখন দেখি রোহিঙ্গাদের পিছমোড়া করে বেঁধে কীভাবে বুটের লাথির পর লাথি মারছে মায়ানমারের সৈনিক। জ্বলন্ত সিগারেট মুখে তারিয়ে তারিয়ে সে ছবি তুলছে আরেকজন সৈনিক। ‘লাইভ’ ভিডিও তুলছে। ঘর-বাড়ি, জমিজিরেত, আত্মীয়স্বজনহারা রোহিঙ্গাদের তাহলে আর কী স্বপ্ন অবশিষ্ট থাকতে পারে? ছবিটাতে আমরা একটি ছোট ছেলে আরাফাতাল্লাহের জবানিতে একটা বৃহত্তর ছবি দেখতে পাই। ছেলেটি এখন বাংলাদেশে রিফিউজি ক্যাম্পে আছে। আমরা যারা দেশভাগ দেখিনি, ক্যাম্পের জীবন সম্পর্কে যাদের সম্যক কোনও অবগতি নেই, মোদ্দা কথা সেই ইতিহাস থেকেই যারা বহু দূরে চলে এসেছি, এ ছবি আমাদের ভাবাবে। খুব গভীরে দেখাবে ছিন্নমূল হওয়া কাকে বলে। এবং এই রক্তাক্ত উচ্ছেদের বিরুদ্ধে সোচ্চার হওয়া কতটা জরুরি।
দক্ষিণ এশিয়ার ছবি তিনটির পরে শুরু হয় দ্বিতীয় সেশন। এই সেশনের প্রথম ছবিতে দেখি পুনে শহরের জনপ্রিয় ‘হেরিটেজ ওয়াক’-গুলি শহরটিকে নতুন করে পেশ করছে ট্যুরিস্টদের কাছে। সেই শহর যেন উচ্চবর্ণের ইতিহাসকেই কেবল বহন করবে বলে গড়ে উঠছে। মনে রাখতে হবে যে মেগা বাজেটের বলিউডি সিনেমাতেও পুনে শহরকে এই ভাবেই দেখানো হয়েছে। কোটি কোটি টাকার ‘বাজীরাও মস্তানি’ ছবিতে পেশোয়া সাম্রাজ্যের জাতিগর্বী প্রতিফলনে পুনে শহরের শনিবারওয়ারা-র মত স্থাপত্য একমাত্র ঐতিহাসিক ঐতিহ্য হয়ে দেখা দিয়েছে, যার প্রতিফলন এই ‘হেরিটেজ ওয়াক’ গুলিতেও পড়ে। উল্টোদিকে, দলিত ও বহুজন সম্প্রদায়ের ঐতিহাসিক অভিজ্ঞানগুলো, পেশোয়া রাজতন্ত্রের বিরুদ্ধে ভীমা কোরেগাঁও-এর দ্রোহের চিহ্নগুলো, শহরের ‘মান্য ইতিহাস’ বা ‘জনপ্রিয় স্মৃতি’ থেকে মুছে ফেলার চেষ্টা চলছে নিরন্তর। কারা সেই মুছে দেওয়া ইতিহাসের অন্তর্গত? জ্যোতিবা এবং সাবিত্রীবাই ফুলে, ফাতিমা শেখ। শুধু দলিতদের বা মুসলমানদের হয়ে যে এঁরা লড়েছেন তাই না, গরীব-নিপীড়িত-অচ্ছুৎ মানুষদের কাছে পৌঁছে দিয়েছেন শিক্ষার আলো। সব চেয়ে আশ্চর্যের বিষয় হল, ফাতিমা শেখ তখনকার দিনের প্রথম ট্রেনিংপ্রাপ্ত শিক্ষিকা। সাবিত্রীবাই ফুলে-কে তাও যদিওবা কেউ কেউ মনে রাখছেন কিন্তু ফাতিমাকে ইতিহাস যেন ভুলেই গেছে। নতুনভাবে গড়ে উঠতে গিয়ে যদি পুনে বা যে কোনও শহরই তার সমাজের সবথেকে জরুরি কারিগরদের ভুলে যায় তবে বুঝতে হবে এ গড়া ভেতরে ভেতরে ভেঙে পড়ারই অন্য নাম। গৌরী পটবর্ধনকে অনুপম এই ছবি ‘ইন আ শ্যাডোলেস টাউন’-এর জন্য ধন্যবাদ।
এমনই আরেকটি বিস্ময়কর ছবি বিবেক গোপীনাথের ‘রামপাত্তর’। গুজরাতের কিছু অঞ্চলে আজও দলিত মানুষদের খেতে দেওয়া হয় ভিন্ন থালা-বাটিতে। এর মুখভরা নাম রামপাত্তর বা রামপাত্র। রামের নাম সাথে জুড়ে দিয়ে বৈষম্যকে চাপা দেওয়ার সম্মতি নির্মিত হয় সমাজে। এমনকি প্রাইমারি স্কুলের মিড-ডে মিলে এই রামপাত্তরের ব্যবস্থা করা যাবে না বলে বাড়ি থেকে আলাদা থালা নিয়ে আসতে বলা হয়। আরও আশ্চর্যের বিষয়, দলিতদের মধ্যেও এই রামপাত্তরের প্রচলন আছে। উচ্চবর্ণেরা তাঁদের সাথে যা আচরণ করেন, তাঁদের এক অংশ সেই একই আচরণ ছুঁড়ে দেন অধিকতর নিপীড়িত বাল্মীকি জাতির মানুষের প্রতি। এখানে একটি অসম্ভব ছুঁয়ে-যাওয়া দৃশ্য হল যখন এক দলিত দম্পতি অভিনয় করে দেখান কীভাবে তাদের রামপাত্তরে খেতে দেওয়া হয়।
আজকের উৎসবের প্রথম অর্ধের শেষ ছবিটি কাহিনিচিত্র। পবন কুমার শ্রীবাস্তবের ‘লাইফ অফ অ্যান আউটকাস্ট’। এক দলিত পরিবারের তিন প্রজন্মকে ধরে রাখে এ ছবি। মুখ্য চরিত্রকে গ্রামছাড়া হতে হয় নিজের স্ত্রীকে জমিদারের কাছে ‘গচ্ছিত’ না রাখবার জন্য। তাঁদের ছেলে, এখন অঙ্কের মাস্টারমশাই হয়েও, জাতিঘৃণার শিকার হন। কারণ, ক্লাসঘরে রামায়নের অন্য ব্যাখ্যা দিয়েছিলেন তিনি। ব্ল্যাকবোর্ডে লিখতে দেননি হিন্দুধর্মের ‘ওঁ’ চিহ্ন। ভুয়ো অভিযোগে জেলে পচেন তিনি। গ্রামের চায়ের দোকানি হয়ে ওঠেন বহির্বিষয় ও বিশ্বের কণ্ঠস্বর। তাঁর শিক্ষা “ওয়াটসঅ্যাপ ইউনিভার্সিটি”-তে। আবহে রামায়ণের গান হয়ে চলে। অপূর্ব ছবি। বহুদিন মনে থেকে যাবে। নির্দেশক পবন কুমার আজ উৎসবে উপস্থিত ছিলেন। প্রদর্শনীর পর সঞ্চালক ও দর্শকদের সুচিন্তিত মতামত ও প্রশ্নের মুখোমুখি হন তিনি।
এরপর, উৎসবের উদ্বোধনী পর্বে পিপল্‌স ফিল্ম কালেকটিভের পক্ষ থেকে দ্বৈপায়ন ব্যানার্জী কালেকটিভের সারা বছরের সাংস্কৃতিক-রাজনৈতিক কাজের অভিমুখ সম্পর্কে বলেন। ছুঁয়ে যান পিপল্‌স ফিল্ম ফেস্টিভ্যালের ছয় বছরের পথ চলাকে। সরকারি বা বেসরকারি ফান্ড না নেওয়ার নীতি ও সেই নীতি মেনে চলার চ্যালেঞ্জ তথা সুফল সম্পর্কে ব্যাখ্যা রাখেন দ্বৈপায়ন। উৎসবের সংগঠকদের পক্ষ থেকে কস্তুরী বসু ষষ্ঠ কলকাতা পিপল্‌স ফিল্ম ফেস্টিভ্যালের সিনেমা-চয়ন পদ্ধতি ও তার সাংস্কৃতিক-রাজনৈতিক সূচীমুখ নিয়ে বক্তব্য রাখেন। এই বছরের নির্বাচিত ৪১টি ছবি সম্পর্কে (এবং জমা পড়া ১৬০০টি ছবি সম্পর্কে) ‘বার্ডস-আই ভিউ’ উঠে আসে তাঁর বক্তব্যে। উদ্বোধনী পর্বের শেষে প্রকাশিত হয় ‘প্রতিরোধের সিনেমা’ পত্রিকার ষষ্ঠ বর্ষ, প্রথম সংখ্যা। তার আগে দার্জিলিং-এর ‘লালী গুরাস’ সমষ্টির পক্ষ থেকে চারজনের দল সঙ্গীত পরিবেশন করেন। নেপালি ভাষায় ‘গাঁও গাঁও বট উঠ’ (প্রতিটি গ্রাম থেকে জাগো) এবং ‘বিস্তীর্ণ দু’পারের’ গানে শ্রোতাদের জাগিয়ে দেন তাঁরা।
আজকের দিনেই রোহিত ভেমুলার শাহাদত দিবস। সেটা স্মরণে রেখেই চলতে থাকে উৎসবের পরবর্তী অংশ। চতুর্থ সত্রের শুরুতে আমরা দেখি অনুপমা শ্রীনিবাসনের ছবি, ‘আর ইউ গোয়িং টু স্কুল টুডে?’ রাজস্থানের আদিবাসী এলাকা দুঙ্গারপুর জেলার একটি সরকারি স্কুল উঠে আসে ছবিটিতে। আমরা সেখানে দেখি স্কুলের শিক্ষক মহাশয়েরা তৎপর হলেও কীভাবে যেন স্কুলের সাথে ছাত্রদের সম্পর্ক ক্রমাগত বিচ্ছিন্ন হয়ে যাচ্ছে। এই সিনেমাটি আমাদের শিক্ষাব্যবস্থার মৌলিক স্তরের গঠনে এক গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন রেখে যাচ্ছে। আমরা দেখছি সামগ্রিক ভাবে দেশের সামাজিক-অর্থনৈতিক অসাম্য কীভাবে শিক্ষা অর্জনের ক্ষেত্রে প্রান্তিকতাকে বয়ে নিয়ে চলছে। সরকারি বরাদ্দে চলা প্লে-স্কুলের অসংখ্য আকর্ষণও কিভাবে এই শ্রেণী-জাত বৈষম্যের সমাজে অকেজো হয়ে উঠছে। ওপর থেকে হাজার জোড়াতাপ্পি দিলেও এই কাঠামোগত সমস্যাকে নির্মূল করা যাবে না, অনেক গভীরে কাজ করতে হবে, ছবিটি যেন শান্তভাবে এই কথাই জানিয়ে দিয়ে যায়। এর পরের সিনেমাটি অমিত মহান্তি নির্দেশিত ‘স্ক্র্যাচেস অন স্টোন’। আমরা দেখি পঞ্চাশ বছর ব্যাপী নাগা স্বাধীনতার যুদ্ধের কিছু স্মৃতিপট যা সংরক্ষিত আছে জুবেনির মেয়েবেলার স্মৃতিতে ও তাঁর তোলা ফটোগ্রাফে। অন্যদিকে বৃদ্ধ খুজুথ্রপার স্মৃতি বহন করে কাঠের খোদাই শিল্প। নাগা স্বাধীনতার যুদ্ধ ও তার মৌখিক ইতিহাসগুলি, নাগা আত্মপরিচয় নির্মাণের ক্রমবহমান প্রক্রিয়া কেমনভাবে হয়ে ওঠে উত্তরপূর্ব ভারতের ইতিহাসের জরুরি অংশ, সেসব খুব নিঃসঙ্গ, প্রান্তিক আখ্যানের মধ্যে দিয়ে উঠে আসে এই ছবিতে। এ যেন ‘আমাদের’ অর্থাৎ ‘মেইনল্যান্ড ভারতের’ ইতিহাস নয়, কিন্তু কেন নয়? এই প্রশ্নে ভাবাতে পারে তাহলে আমাদের দেশের মধ্যে তবে বর্ণবিদ্বেষ আর প্রান্তিকরণের রাজনীতি কীভাবে কাজ করে।
শুধু কি বর্ণবিদ্বেষ? আমরা আজকের ‘রামপাত্তর’, ‘ইন আ শ্যাডোলেস টাউন’ ছবিগুলিতে দেখেছি আমাদের মহান ভারতবর্ষে কীভাবে ‘জাতবিদ্বেষ’ কাজ করে। কতটা নৃশংস অমানবিক একটি সমাজের জন্ম দিতে পারে এই ব্যবস্থা। যে সমাজের ইতিহাসও একপাক্ষিক হয়ে ওঠে। তেমনই আজকে, উৎসবের প্রথম দিনের শেষ পর্বে সঞ্জয় বার্নেলা ও ফারহা নাকভি নির্দেশিত ‘দা কালার অফ মাই হোম’ ছবিটি এই দেশের ‘ধর্মবিদ্বেষ’-এর সাক্ষ্য বহন করে। এ ছবি ফিরে দেখে সেই ২০১৩ সালের মুজফ্‌ফরনগর দাঙ্গাকে, যেখানে ষাট জন মানুষ খুন হন, ষাট হাজার মানুষ বাস্তুহারা হন, আর সরকারি রিলিফ ক্যাম্পে চল্লিশজন মানুষ বেঘোরে শীতের আক্রমণে মারা যান। যে মানুষদের বাড়িঘর পোড়ে, জন্মমাটি ছেড়ে যেতে হয়, সেই মানুষদের নতুন জীবন নিয়ে এই সিনেমাটি। জন্মভিটে, বাপ-দাদার কবরস্থান ফেলে আসতে হয়, সন্তানের জীবন যাতে সুরক্ষিত থাকে। কিন্তু মুছে দেওয়া সম্ভব হয়না পুরনো দেওয়ালের প্রিয় ফিরোজা রঙ আর মোছা সম্ভব হয়না মৃতদেহ আর দাঙ্গার দৃশ্যপট নিয়ে আসা সন্তানদের মনে গেঁথে-যাওয়া স্মৃতি। তবুও নতুন জীবন শুরু হয়। কারণ জীবন বড্ড আজব লড়াই।
আর এসব আজব জীবনের বর্ণবিদ্বেষ-জাতবিদ্বেষ-ধর্মবিদ্বেষ সমেত এমন অসংখ্য বৈষম্য, বঞ্চনা, হিংসার বিরুদ্ধে কথাগুলো যখন সিনেমার বড় পর্দায় আর পর্দার বাইরে সোচ্চার হয়ে উঠতে থাকে, তখন ধূর্ত ক্ষমতাবানেরা আমাদের এই কথাগুলো দাবিয়ে দিতে চায়। আমাদের জন্য তৈরি হয় গণ্ডি। সমর্থ মহাজনের ‘উই দা পিপল’ সিনেমাটি আমাদের দেশের সরকারের তৈরি করে দেওয়া এমনই একটি গণ্ডি, নয়া দিল্লির ‘প্রতিবাদের রাস্তা’ যন্তরমন্তর রোডে ঘটে চলা অলীক কুনাট্যের ওপর ফোকাস করে। দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে একলা অথবা যূথবদ্ধ হয়ে আসেন সেই সব মানুষ যারা ন্যায় বিচারের জন্য ঘাম রক্ত ঝরিয়ে চিৎকার করছেন, কিন্তু সেই ‘শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদ’-এর স্বর শোনার কেউ নেই। যন্তরমন্তরে কি শোনা হয় তাঁদের আর্জি? এক ব্যক্তি নিজের জীবিত থাকার প্রমাণ দিতে এসেছেন, এক নির্যাতিত মহিলা এসেছেন বিচার চাইতে, অন্যদিকে দেশের কৃষক শ্রমিকেরা আসছেন নিজেদের দাবির কথা জানাতে। ছাত্ররা আসছেন প্রতিবাদে মিছিলে। আমরা দেখি ধর্মীয় বিদ্বেষ ছড়ানোর মিছিল হচ্ছে এই একই স্থানে। সব মিলিয়ে সরকারের তৈরি এ যেন এক সুর্‌রিয়্যাল রঙ্গমঞ্চ। আমাদের এই সিনেমাটি দেখায় দমনমূলক অথরিটির বিরুদ্ধে লড়তে হলে অথরিটিরই নির্ধারণ করে দেওয়া সীমানাতে তা সম্ভব নয়। লড়াইতে নিজেদের ব্যারিকেড গড়তে হয় আর দমনকারী অথরিটির তৈরি ব্যারিকেড ভাঙতেও হয়। নইলে যন্তরমন্তরের সীমানা কেবল আমাদের গুরুত্বপূর্ণ বাঁচার লড়াইগুলোকেও প্রহসন বানিয়ে দিতে পারে।
সমকালীন সময়ের প্রেক্ষিতে খুব গুরুত্বপূর্ণ এই সিনেমাগুলো নিয়ে শেষ হল আমাদের ১৭ তারিখের জনতার সিনেমা উৎসবের প্রথম দিন। ১৮-১৯-২০ এই কয়েকদিনও চলবে আমাদের এই ভিন্নধারার সিনেমা উৎসব। আপনারা আসুন, সবান্ধবে। আমরা একসাথে ভিন্নভাবে ভাবি, সিনেমা দেখি, ও মতামত আদানপ্রদান করি। যা এই বদ্ধ, মূক, পচা সময়ের বুকে এক জরুরি কর্মসূচী।
0 replies

Leave a Reply

Want to join the discussion
Feel free to contribute!

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *