।। ২১ জানুয়ারি, ২০১৮।।

,
চতুর্থ দিনের প্রথম ছবি ছিল জয়ছেং জয় দোহুতিয়া পরিচালিত হান্দুক। হান্দুক ছবির গল্প আসামের আলফা আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে ঘটে চলা তিন চরিত্রের অপেক্ষার কাহিনী। এই ছবিটি যাঁরা এই অভ্যূত্থান প্রত্যক্ষ করেছেন তাঁদের অভিজ্ঞতার রসদে, বিশেষত মোরান জনগোষ্ঠীর মানুষের উপর নির্মিত এধরনের প্রথম কাহিনীচিত্র।
এর পরের ছবি ছিল রাহুল জৈন পরিচালিত তথ্যচিত্র মেশিনস। কালো খয়েরী আর স্যাঁতস্যাঁতে রঙের অনবদ্য ফ্রেমিং এ ধরা পড়ে শ্রমজীবী মানুষের দৈনন্দিন। কাপড়ের মিলের কাপড় ছোপানো হয় অপ্রাপ্তবয়স্ক শ্রমিকদের দৈহিক শ্রমে। ছবির একটা বড় অংশ জুড়ে শুধুমাত্র আবহে ভারী মেশিন চলার আওয়াজ যোগেশ মাইমের দর্শকের কাছে অন্য মাত্রায় হাজির করে শ্রমজীবী মানুষের বাস্তবতা, যেখানে “জো লেবার বকরী হ্যায় উও শের বন জায়গা।” ইউনিয়ন শ্রমিকদের কখনো পয়সা দিতে পারে না, কিন্তু কন্ট্রাক্টর পারে, আর তাই শ্রমের অসম বন্টনে বারবার জিতে যায় তারা। কন্ট্রাক্টর দম্ভের সঙ্গে বলে শ্রমিকরা বিন্দুমাত্র বেশি মজুরি পেলেই তারা কোম্পানির ভবিষ্যতের কথা ভাবা বন্ধ করে দেয়! রুক্ষ লং শটের মধ্যে উড়িয়ে দেওয়া হয় শুকোতে দেওয়া কাপড়। ছবির শেষে সতর্ক ক্যামেরাইয় ধরা দেয় মিলের বাইরের মজুরের দল, যারা জানে এই ক্যামেরা তাদের সুখদুঃখের সাথী না, নেতাদের মতোই এরা কখনো আসবে, কখনো না, তাদের একমাত্র সান্ত্বনা, গরীব বড়লোক সবাই মারা যাওয়ার সময় খালি হাতেই যায়।
এর পরের ছবি এক মওতঃ কুছ সওয়াল থেকে শুরু করে এর পরপর তিনটি ছবি দেখতে হল ভরে লোক আসা এই ফেস্টিভ্যালের এক বড় পাওনা, শুধু ছবি দেখার জন্য নিজের মতো করে জায়গা খুঁজে নেওয়া এবং না পেলে মৃদু অনুযোগ। প্রায় দশ বছরের বেশি সময় ধরে চলা এই ছবি শঙ্কর গুহনিয়োগী এবং তার লড়াইয়ের বহমানতাকে তুলে ধরে। টাকার অভাবে বহুদিন ধরে শুটিঙের পরেও বন্ধ থাকে ছবি বহুবছর এবং তারপরে আবার তা শেষ করা সম্ভব হয়। এম এল থেকে বহিষ্কৃত হওয়ার পরেও রাজনীতি ছেড়ে দিয়ে নিয়োগী ছত্তিশগড় মুক্তি মোর্চা নির্মাণ করেন, কারণ সবসময়েই তাঁর বিশ্বাস ছিল সংঘর্ষ ও নির্মাণ। ডাক্তার শৈবাল জানা, বিনায়ক সেন, আশিষ কুণ্ডু এবং পুণ্যব্রত গুণের কথোপকথনের মধ্যে মধ্যে জয়রাম, লীলাবাঈ এর কন্ঠে আমরা জানতে পারি মোর্চা কি করে সংগঠন বজায় রাখে, গড়ে তোলে মহিলা মুক্তি মোর্চা। বর্তমান ভারতে কি করে সম্ভব গুহনিয়োগীর বহমানতা রক্ষা, কি করেই বা সম্ভব তাঁর অনুপ্রেরণায় নিজস্ব উদ্যোগ নেওয়া? ছবির নির্মাতা এবং দর্শকদের মধ্যে ছবি পরবর্তী আলোচনায় উঠে আসে বর্তমান ভারতের বিভিন্ন রাজনৈতিক ঘটনা।
পরবর্তী ছবি কস্তুরী বসু ও মিতালী বিশ্বাস প্রযোজিত ও নির্দেশিত এস.ডি. – সরোজ দত্তের উপর নির্মিত একটি তথ্যচিত্র। এই ছবিটিতে উঠে এসেছে সরোজ দত্তের জীবনের বিভিন্ন না দেখা দিক, বিপ্লবী সরোজ দত্ত এবং লেখক, কবি সরোজ দত্ত, তাঁর শশাঙ্ক নাম্নী কলম, ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে যায়, সমৃদ্ধ করে একে অন্য সত্তাকে। বহু আর্কাইভ ঘেঁটে বের করা খবরের পাতায়, কমরেড বেলা দত্ত, দেবীপ্রসাদ চট্টোপাধ্যায়ের কন্ঠে আমরা জানতে পারি এক অন্য এস.ডি-র কথা। যিনি আন্দোলনের সাথে সাথে নির্মাণ করতেন পুরাণের নতুন ব্যাখ্যা, যে ব্যাখ্যা শুধুই ব্যক্তিগত নয়, বরং তীব্রভাবে রাজনৈতিক। একই রাজনীতির তাঁকে তাড়িয়ে বেড়িয়েছে পরিচয় থেকে দেশহিতৈষী থেকে দেশব্রতী পত্রিকায়। যে ধীশক্তিতে একবারেই অনুবাদ করেছেন লুমুম্বার কবিতা সেই একই স্থিরতায় মেনে নিয়েছেন পুলিশী ধরপাকড়। তাঁর লেখা কবিতা, ময়দানের দৃশ্য, উত্তর কোলকাতার গলি, মৃণাল সেন এবং ঋত্বিকের মন্তাজ ফিরিয়ে নিয়ে যায় সত্তর দশকের উত্তাল বাঙলায়, যে ফেরা শুধুই ব্যক্তিগত নস্টালজিক নয়, প্রবলভাবেই রাজনীতি সচেতন। ছবি পরবর্তী আলোচনায় দর্শক ও নির্মাতাদের কথোপকথনের মাধ্যমে শেষ হয় ডকুমেন্টারি প্রিমিয়ার সেকশনটি।
এর পরের অংশে একতারা কালেকটিভের তুরুপ ছবি দেখানো হয়। চন্দা কে জুতে এবং জাদুই মচ্ছির পর ভূপালের একতারা কালেক্টিভ আবারো হাজির তাঁদের চমকপ্রদ ছবি নিয়ে। তুরুপ ভূপালের চাক্কী চৌরাহার দাবা খেলার নেশার গল্প হলেও তার মধ্যে উঠে আসে বিভিন্ন স্তরের পর স্তর, যা বর্তমান ভারতের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটের প্রতিচ্ছবি। দাবা এবং কবীরের গান প্রতীক হয়ে ওঠে সমাজের বিভিন্ন স্তরের, বিভিন্ন জনজীবনের যুদ্ধ পরিস্থিতির। উলুবেড়িয়ার মলিনা মিদ্দে হয়ে ওঠেন তুরুপের মণিকা, যিনি তাঁর গৃহকর্ত্রীর পালটা জবাবে, দাবার দানে এবং পুরনো ফ্রেমে তাজমহলের যুগল মহিলা ছবির সামনে ফুল রেখে সমান স্বচ্ছন্দ। সমস্ত স্তরে তুরুপের অনায়াস চলাচল, যা কখনো চড়া দাগের হয়ে ওঠে না, সমস্ত চরিত্রাভিনয়ে পেশাদারী অভিনেতা বাদ দিয়েও যে ছবি দাগ কেটে যায়, তা সম্ভবপর হয় তুরুপের মাধ্যমেই।
ছবি পরবর্তী আলোচনায় বিশেষ করে উঠে আসে এরকম অভিনব উদ্যোগ স্থায়ীভাবে বজায় রাখার প্রশ্ন, যার আলোচনায় উপস্থিত ছিলেন সুশীল, শিবানী, মলিনাসহ একতারা কালেকটিভের এক বড় অংশ। আলোচনায় নতুন দিশা দেখায় একতারা, যাতে শুধুমাত্র ছবির বিষয়বস্তু দিয়েই তথাকথিত মূলধারার ছবির বিরোধীতা নয়, কীভাবে চলচ্চিত্রকে সত্যিই সাধারণ মানুষের কাছে নিয়ে আসা সম্ভব তা নিয়ে ভাবনাচিন্তা করছেন একতারা। তুরুপ ছবির ক্ষেত্রেই যেমন সমস্ত সাউন্ড রেকর্ডিং হয়েছে কোন বহুমূল্য স্টুডিওতে নয়, এক ক্ষেতের মাঝখানে এক ঝুপড়িতে, যেখানেও প্রতিধ্বনি এড়ানো সম্ভব।
পিপলস ফিল্ম ফেস্টিভ্যালের ধারা বজায় রেখে শেষ দিন শেষ হয় পাকিস্তানী পরিচালক মারা আহমদের ছবি আ থিন ওয়াল দিয়ে। যাতে ভারত ও পাকিস্তানের দুইপারের বিভিন্ন আখ্যানে আমরা দেশভাগের বাস্তবতার স্বরূপ জানতে পারি। ছবি পরবর্তী আলোচনায় সুর্ভী দেওয়ান এবং মিঠুনের সঙ্গে কথোপকথনে উঠে আসে ছবি সংক্রান্ত বিভিন্ন কাহিনী। মূলত দেশভাগের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিগত স্মৃতিকে রক্ষণ এবং জনগণের কাছে পৌঁছে দেওয়ার উদ্দেশ্যেই তৈরী হয় এই ছবির বিষয়বস্তূ। যাঁরা দেশভাগ প্রত্যক্ষ্য করেছেন তাঁদের দৈনন্দিন, ব্যক্তিগত -কে তুলে ধরে দেশভাগের উপর ছবির ভাণ্ডারে এক অন্য মাত্রা জোগায় এই ছবিটি, ভাঙতে চেষ্টা করে পাকিস্তানের উপর দোষ চাপিয়ে পরিত্রাণ পেতে চাওয়া এক প্রচলিত ধারণার।
এইভাবেই এই বছরের মতো এই চারদিনের উৎসবের সমাপ্তি ঘটে মনে রেখে দেওয়ার মতো একরাশ ছবি, অভিজ্ঞতা আর নতুন নতুন দর্শক প্রাপ্তির মধ্য দিয়ে।
0 replies

Leave a Reply

Want to join the discussion
Feel free to contribute!

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *