ফ্রেমস অফ ফ্রিডম: সোভিয়েত স্বপ্নের একশ’ বছর

ত চার বছর ধরে ১৫ই অগাস্টের দিন পিপল্‌স ফিল্ম কালেকটিভের পক্ষ থেকে আমরা আয়োজন করছি ‘ফ্রেমস অফ ফ্রিডম’ চলচ্চিত্র প্রদর্শনীর। এখানে দেখানো ছবিগুলি সাধারণতঃ প্রত্যেক মাসে আমাদের দেখানো ছবিগুলি বা আমাদের বাৎসরিক উৎসবে দেখানোর ছবির থেকে বেশ খানিকটাই আলাদা।

‘ফ্রেমস অফ ফ্রিডম’-এ আমরা চাই মুক্তি ও স্বাধীনতার নানান মানে কে উলটে পালটে দেখতে। বুঝতে। জানতে। স্বাধীনতার যে একক ও সমসত্ব ধারণাকে রাষ্ট্র আমাদের মানতে বলে, যা আদতে রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্বের উদ্‌যাপন ছাড়া আর কিছু নয়। তার বাইরে স্বাধীনতার মানে কী? মানুষের সমতার প্রতি, বিষমতার বিরুদ্ধে লড়াইয়ের, স্বপ্নের, সংগ্রামের ইতিহাসকে বাদ দিয়ে কী মানবীয় স্বাধীনতাকে বোঝা যায়? এই অনুষ্ঠানে আমরা এই প্রশ্নেরই জবাব খুঁজি।

এবছর আমরা ফিরে দেখব সোভিয়েত স্বপ্নকে। মানবীয় স্বাধীনতার স্বপ্ন। যে স্বপ্ন সারা পৃথিবীতে নতুন অনেক স্বপ্নের জন্ম দিয়েছিল। আবার যার ভেঙে যাওয়া চাপা দেওয়া অনেক প্রশ্নকে ফের আমাদের সামনে তুলে এনেছে। এই দিন যে ছবিগুলি আমরা দেখব তার মধ্যে দিয়ে সোভিয়েত ইউনিয়নের ইতিহাসকে যেমন আমরা ফিরে দেখব, তেমনই ফিরে দেখব সোভিয়েত সিনেমার অক্ষপথকেও। সময় সংক্ষিপ্ত। তাই আমরা চেষ্টা করেছি এমন ছবিকেই মূলতঃ বাছতে যা আমাদের বর্তমান সময়ের সাথেও কথা বলে। যে ছবিগুলি খুবই পরিচিত, যেমন সার্গেই আইজেনস্টাইনের ব্যাটেলশিপ পোটেমকিন, তাদের আমরা এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেছি। কারণ, কলকাতার অনেক উৎসাহী দর্শকই ছবিগুলি আগে দেখেছেন। আবার, আমরা বিভিন্ন কালপর্বের প্রতিনিধিত্বমূলক ছবিকে বাদ দিয়ে যেতেও চাইনি। বিগত একশ’ বছরের সময়কালকে বোঝার জন্য আমরা সোভিয়েত-পরবর্তী সময়ে নির্মিত দু’টি ছবিকেও জায়গা দিয়েছি। একটি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়কার লেনিনগ্রাদের অবরোধের প্রেক্ষাপটে, অন্যটি সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনকে ঘিরে। দ্বিতীয় ঘটনাটি যে বিশ্ব-রাজনীতিকে চিরদিনের মত বদলে দিয়েছে তা বললে অত্যুক্তি হয় না।

ছ’টি ছবির সময়কাল ১৯২৫ থেকে ২০১০ পর্যন্ত বিস্তৃত। এই ছবিগুলি দেখতে দেখতে আপনি সোভিয়েত রাশিয়ার ইতিহাসের পাতা উলটে দেখে নিতে পারবেন। শুরুর দিকের স্বপ্ন, আশাবাদ, উদ্ভাবন এবং সক্রিয়তা। স্তালিন আমলের ওপর থেকে চাপিয়ে দেওয়া সমাজতান্ত্রিক বাস্তবতা। যুদ্ধপরবর্তী সময়ের নিরানন্দ ও বিভ্রান্তি। স্থিতিজাঢ্য। পেরেস্ত্রোইকার সময়ের দ্বন্দ্ব। এক অঢেল আশা জাগানো স্বপ্নের ভেঙে পড়া। সোভিয়েত যে প্রজন্ম দেখেছে এই ভাঙন, তারা একই সাথে তিক্ত, আর আশাবাদী। তীব্রভাবে প্রতিষ্ঠান-বিরোধী আবার আশ্চর্যজনক ভাবে ‘অ্যাপলিটিক্যাল’। যে প্রজন্ম আমাদের দেশে আশির দশকের শেষে আর নব্বইয়ের দশকের শুরুতে বড়বেলায় পা ফেলছিল এক নব-উদারবাদী রাষ্ট্রে, তাদের সাথে সোভিয়েতের এই প্রজন্মের মিল অনেক জায়গায়।

দিনের প্রথম ছবি আইজেনস্টাইনের স্ট্রাইক। ওঁর তৈরি প্রথম পূর্ণদৈর্ঘ্যের ছবি। ব্যাটেলশিপ পোটেমকিন-এর বছরেই তৈরি। ওই সময়টা ছিল সোভিয়েত সিনেমায় বৈপ্লবিক পরীক্ষা-নিরীক্ষার সময়। যেমন প্রয়োগে, তেমনই তত্ত্বে। আইজেনস্টাইন, জিগা ভার্তভরা এমন এক সিনেমার ভাষার সন্ধান চালাচ্ছিলেন যা বিপ্লব-পরবর্তী সময়ের সাথে সাযুজ্যপূর্ণ। পুঁজিবাদী সিনেমার থেকে শুধু বিষয়ে নয়, কাঠামোতেও আলাদা। প্রলেতকাল্টের মত র‍্যাডিক্যাল পরীক্ষা-ধর্মী দলগুলি তখনও সক্রিয়। স্ট্রাইক ছবিটিতেই অভিনয় করেছিলেন প্রলেতকাল্টের সদস্যরা। ছবিটি বিপ্লব-পূর্ববর্তী রাশিয়ার এক কারখানার স্ট্রাইকের গল্প। সমষ্টিই এখানে প্রধান চরিত্র। এই সময়ের অন্য গুরুত্বপূর্ণ ছবির মধ্যে উল্লেখযোগ্য, জিগা ভার্তভের ম্যান উইথ এ মুভি ক্যামেরা (১৯২৯), পুদোভকিন-এর মাদার (১৯২৬), এবং ইউক্রেনের পরিচালক আলেকজান্ডার দভজেন্‌কোর আর্থ (১৯৩০)।

এর পরের ছবি, মিখাইল কালাদোজভের দ্য ক্রেনস আর ফ্লায়িং (১৯৫৭)। বর্তমানে ধ্রুপদী বলে গণ্য হওয়া এই ছবিটি তৈরি হয়েছিল স্তালিন-পরবর্তী সময়ে। তখন ফিল্ম সেন্সরশিপ অনেকটাই নরম হয়েছে। এই ছবির মুখ্য চরিত্র ভেরনিকার প্রেমিক বরিস যুদ্ধে প্রাণ দেয়। ভেরনিকার চোখ দিয়ে আমরা দেখি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ মানবিক সম্পর্কে কীভাবে ছায়াপাত করেছে। এই ছবির আগে ভেরনিকার মতো নিজের অস্মিতা সম্বন্ধে সচেতন এক জটিল নারী চরিত্র সোভিয়েত সিনেমায় সেইভাবে দেখা যায় নি। এই সময়কার অনেক গুরুত্বপূর্ণ ছবির মধ্যে রয়েছে গ্রেগরি চুখরাই-র ব্যালাড অফ এ সোলজার (১৯৫৯)। এই ছবিটিও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের মানবীয় মূল্যকে ঘিরে। এই সময়কার আরও বেশ কিছু ছবি একই বিষয় নিয়ে তৈরি হয়েছিল। এই ধারার ছবিগুলি যুদ্ধ নিয়ে তৈরি দ্য ফল অফ বার্লিন (১৯৫০)–এর মত আগের দশকের ছবির থেকে লক্ষ্যণীয় ভাবে আলাদা।

তৃতীয় ছবি, মিখাইল রমের ১৯৬৫ সালে তৈরি অর্ডিনারি ফ্যাসিজম। আমেরিকায় এই ছবিটা প্রদর্শিত হয়েছিল ট্রায়াম্ফ ওভার ভায়লেন্স নাম দিয়ে। ছবিটা নাজি আর্কাইভে থাকা ফুটেজ ব্যবহার করে নির্মাণ করে ইউরোপে ফ্যাসিবাদের উত্থান ও পতনকে। ছবিটা অনেক দিক দিয়েই এসফির শাবের ধ্রুপদী ডকুমেন্টারি ছবি দ্য ফল অফ রোমানভ ডাইনাস্টি (১৯২৭)–এর সাথে তুলনীয়। যা একই ভাবে জারের আর্কাইভের ফুটেজ ব্যবহার করে জার-তন্ত্রের পতনের কাহিনী নির্মাণ করেছিল। এই সময়ের একাধিক ছবি ক্লাসিকের মর্যাদা পায়। যেমন, সার্গেই পারাজনভের শ্যাডোস অফ ফরগটেন অ্যানসেস্টরস (১৯৬৪), কালার অফ পমেগ্রানেটস (১৯৬৯), বা আন্দ্রেই তারকোভস্কির ইভান্‌স চাইল্ডহুড (১৯৬২), আন্দ্রেই রুবলভ ( ১৯৬৬)। কিন্তু, আমরা এই ছবিগুলোর তুলনায় তুলনামূলক-ভাবে কম পরিচিত এই ডকুমেন্টারিটা বেছে নিয়েছি কারণ সাড়া বিশ্বে  মাথাচাড়া দেওয়া ফ্যাসিবাদ ও দক্ষিণপন্থী পপুলিজমের যুগে এই ছবিটা আমাদের সাথে কথা বলে। ভয় দেখায়। শিক্ষা দেয়।

এ দিনের চতুর্থ ছবি, ইউরি নরস্টাইনের টেল অফ টেলস (১৯৭৯) –এর মুখ্য চরিত্র স্মৃতি। ফেলে আসা সময়ের। শৈশবের। ইস্টার্ন ফ্রন্টের সৈনিকদের। বহু সমালোচকের মতে এই ছবিটা বিশ্বের সেরা অ্যানিমেশন ছবি। সেই সময়ের অনেক সোভিয়েত ছবির মতই এই ছবিটিও সহজ গল্পের বদলে মানব অস্তিত্ব নিয়ে প্রশ্ন তোলে। ভাবায়। সোভিয়েত রাশিয়ায় অ্যানিমেশন ছবির এক দীর্ঘ ইতিহাস আছে। জিগা ভার্তভ ও আলেকজান্দার বুশকিনের অ্যানিমেশনের ভাষায় অ্যাজিট-প্রপ বানানোর পরীক্ষা থেকে শুরু করে, ব্রুমবার্গ বোনেদের তৈরি ছোটদের ছবির আশ্চর্য জগত থেকে, ফিওডোর খিটরুখের ব্যাঙ্গাত্মক অ্যানিমেশন। এই বিস্ময়কর ছবির জগতের কথা এখন প্রায় সবাই ভুলেই গেছে। এই ছবিটির মাধ্যমে সেই ভুলে যাওয়া জগতের সাথে পরিচয় হবে দর্শকদের।

পরের দুটো ছবিই সোভিয়েত পতনের পরবর্তী সময়ে বানানো। সের্গেই লোজনিৎসার ২০০৬ সালের ডকুমেন্টারি ব্লকাডাঅর্ডিনারি ফ্যাসিজম-এর মত এ ছবিও ব্যবহার করে আর্কাইভাল ফুটেজ। দেখে নিই, নাজি বাহিনী কর্তৃক লেলিনগ্রাদের অবরোধ। লাখ লাখ মানুষের মৃত্যু। নাজিদের পরাজয়। রবিন হেসম্যানের ২০১০ সালে তৈরি ডকুমেন্টারি ছবি মাই পেরেস্ত্রোইকা সোভিয়েত পতনের অদ্ভুত সময়কে ফিরে দেখে পেরেস্ত্রোইকা-প্রজন্মের কিছু তিক্ত এবং সিনিকাল মানুষের স্মৃতি-অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে। ধরা পরে সোভিয়েত রাশিয়ার দ্বন্দ্ব। আবার পতন পরবর্তী হতাশা। আশাভঙ্গ। রাজনৈতিক হাঙরদের রাজত্ব।

সরল আশাবাদ, বা নিরাশার অন্ধকার – এই দু’য়ের বাইরে গিয়ে সোভিয়েত রাশিয়াকে ঘিরে গড়ে ওঠা স্বপ্নকে বুঝতে চায় ‘ফ্রেমস অফ ফ্রিডম’। এড়িয়ে যেতে চায় না অস্বস্তিকর প্রশ্নদের। কিন্তু, মানবীয় স্বপ্নের এই অভিজ্ঞতাকে সম্মানও জানাতে চায় এই অনুষ্ঠান। চারপাশের দানবীয় বাস্তব, স্বাধীনতার হরণের বিরুদ্ধে সেটা আমাদের ভর দিয়ে দাঁড়ানোর জায়গা।

___

ফ্রেমস অফ ফ্রিডম, ২০১৯

১৫ই অগাস্ট, সকাল ১১টা থেকে রাত ৯টা

যোগেশ মাইম অ্যাকাডেমি প্রেক্ষাগৃহ, কালীঘাট পার্ক

প্রবেশ অবাধ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *