তারায় মোড়া সিনেমা-...

এই শীতে আমাদের লিটল সিনেমার পক্ষ থেকে ছোটদের সিনেমা দেখাতে আমরা গেছিলাম সাঁতরাগাছি। ফেলে আসা রামনবমীর দিনে আমরা আগে একবার গিয়েছিলাম একই কাজে। বন্ধ কারখানা এলাকা, পুরনো আর নতুন জীবন গায়ে গায়ে মিশে এক শহরতলীর ক্লাবঘরের মাঠ। এই অসময়ে সাঁতরাগাছি স্পোর্টিং ক্লাবের উদ্যোক্তারা চেয়েছিলেন তাদের আগামী প্রজন্ম এই চলতি অরাজকতার মধ্যে কিছু বিকল্পের অনুসন্ধান করুক, একটু ভিন্নভাবে ভাবতে শিখুক।
আমার সাথে অনেকেরই তর্ক হয়, যখন আমি লিটল সিনেমা নিয়ে আমার ভালোলাগার আর ভালোবাসার উপলব্ধিগুলো বলি। কিছু বন্ধুর মনে হয় যে পুঁজিবাদ ও ফ্যাসিবাদী রাষ্ট্র তার প্রবল আগ্রাসনে আমাদের মাথাগুলো বাজার আর ধর্ম দিয়ে দখল করে নিচ্ছে – এরকম সময়ে কীভাবে আমরা একদিন কোনও একটা জায়গাতে কয়েকটা সিনেমা দেখিয়ে পরিস্থিতি মোকাবিলা করবার কথা ভাবতে পারি? তবে একদিন এই শহরের একটি কৃষক মিছিলের ভিডিও আমাকে একটা সুস্পষ্ট পক্ষ অবলম্বন করতে সাহায্য করে। ভিডিও-তে দেখলাম শহরতলির একটি বাচ্চাদের স্কুলের সামনে দিয়ে যখন ঐ মিছিলটা যাচ্ছিল, সে সময়ে জানলাতে ভিড় করা কচিকাঁচারা সমবেত ভাবে কৃষকদের সাথে স্লোগান দেয়, ‘কমরেড, কমরেড, গড়ে তোল ব্যারিকেড’। আমার মনে হয় দেশের ঠিক এই পরিস্থিতিতে যেখানে শিশু-কিশোরেরা ‘জয় শ্রীরাম-জয়-হনুমান’ এর স্লোগানের মধ্যে হিংসার আস্ফালন দেখছে, সেখানে ‘কৃষকের অধিকারে গড়ে তোল ব্যারিকেড’ এর স্লোগান কি ভীষণ তাৎপর্যপূর্ণ! আমাদের লিটল সিনেমার তাৎপর্য ঠিক এখানেই। যখন আমাদের শিশুরা একটু একটু করে পুঁজিবাদী রাষ্ট্রের আগ্রাসনের শিকার হচ্ছে এমন সময়ে একটু বিকল্পের সন্ধান দিতে পারা। যে বিকল্পটুকুকে আঁকড়ে অন্তত কিছু কচিকাঁচা শিশুরা এই হিংসার পৃথিবীকে প্রশ্ন করতে শিখবে।
বার্ট হানস্ট্রার ‘জু’, চার্লি চ্যাপলিনের ‘সিটি লাইটস’ আর ‘মর্ডান টাইমস’-এর কিছু অংশ, সত্যজিত রায়ের ‘টু’, সেরদুল আলতানের ‘কাইট’, আব্বাস কিয়ারোস্তামির ‘কোরাস’ সহ আরও কিছু ছোট ছবি ছিল এদিন আমাদের ঝুলিতে। সাঁতরাগাছিতে বাচ্চারা ‘জু’ দেখে মতবিনিময় করে। পশু-পাখি আর আমরা একই, আমাদের মতোই ওদের জীবন আছে, তাই তাদের আঘাত করা উচিৎ নয়। চ্যাপলিনের ‘সিটি লাইটস’ দেখার পর কথায় কথায় উঠে আসে যে সময়ে চার্লি চ্যাপলিন সিনেমা বানাতেন, সেই সময়টা ছিল পৃথিবীর এক ভীষণ নিষ্ঠুর আর যুদ্ধ-বিধ্বস্ত হিংসার সময়। সেখানে চার্লির ভবঘুরে এমন একজন হিরো যে হেরে যায়, কিন্তু ‘সিটি লাইটস’ দেখতে দেখতে বাচ্চারা জানায় তারা চার্লি হেরে গেলেও তার পক্ষে।
পরবর্তী সিনেমা ‘মর্ডান টাইমস’-এ আমরা একসাথে দেখে নেই মানুষকে কীভাবে মেশিনে পরিণত করে তোলে এই পুঁজিবাদী ব্যবস্থা। এই সিনেমাটা বন্ধ হওয়া কারখানা মিল অঞ্চলের নতুন প্রজন্মের কাছে কীভাবে পৌঁছতে পারে সেটা আমাদের ধারণার বাইরে হয়তো। কারণ এর পরের সিনেমা সত্যজিৎ রায়ের ‘টু’ দেখার পর ছোট্ট দর্শক চন্দ্রিলা যেভাবে সিনেমাটি বিশ্লেষণ করলো আমরাও কোনোদিন এভাবে ভাবতে পারিনি! সে ছবিটি দেখে জানায় সিনেমাটি দেখে তার মনে হয়েছে একজনের কাছে সব কিছু আছে তবুও সে তৃপ্ত নয়, আরেকজনের কাছে কিচ্ছু নেই তবুও সে তৃপ্ত এটাও হতে পারে; তারপর এই দু’জনের মধ্যে খুব লড়াই হয়। আমরা দেখি যার কাছে সব আছে মানে যে ক্ষমতাশালী সে যেন জিতে যাচ্ছে বলে মনে হচ্ছে। তবে শেষে গিয়ে আমরা দেখলাম যার কাছে কিছু নেই সেই জিতে গেল কারণ একপক্ষে ‘পাওয়ার’ অন্যপক্ষে ‘লিবার্টি’ (পরিভাষা চন্দ্রিলার)। আর এদের মধ্যে সবসময় লিবার্টিই জিতবে।
‘টু’ এর পর আমরা সকলে মিলে ‘কাইট’ দেখলাম, যা যুদ্ধবাজ বোমারু বিমানের সাথে শিশুদের তৈরি ঘুড়ির অসম লড়াই-এর গল্প। আমাদের খুদে দর্শকেরা রংবেরঙের ঘুড়ির পক্ষ নিল। তাদের মনে হল, একদিন অনেক বড় লাটাইয়ের সুতো তৈরি করে যুদ্ধবিমানের পথ আটকে ফিরিয়ে দেওয়া যাবে।
আমাদের শেষ সিনেমাটি ছিল কিয়ারোস্তামির ‘কোরাস’। যে ছবিতে আমরা দেখি, বৃদ্ধ দাদু কানে শুনতে পান না, ইচ্ছে হলে কান থেকে খুলে রাখেন শ্রবণের যন্ত্র। নাতনি বাড়ি ফিরে দেখে দরজা বন্ধ। একটা জানলা দিয়ে চিৎকার করে কোন লাভ হয় না। কিন্তু যখন তার চিৎকারে আরও অনেক কচিকাঁচা জড়ো হয়ে সমবেত চিৎকার করে সেই অনুরণন দাদুর কাছে পৌঁছায়। সিনেমাটি দেখে চন্দ্রিলা সহ অনেকই মতবিনিময় করে জানায়, যখন একলা কোনও কথা শোনানো যায় না, তখন আমাদের একত্রিত হয়ে সেই কথাগুলো বলা উচিৎ। এই সূত্রে উঠে আসে আমাদের দেশের কৃষক আত্মহত্যার কথা, এবং সবশেষে রাজপথে সমবেত চিৎকারের এই বর্তমান প্রেক্ষিত। ২৫ ডিসেম্বরের রাতে মাথায় হিম নিয়ে খোলা মাঠে একটানা বসে এই সিনেমাগুলো দেখা ও সেগুলো নিয়ে আমাদের সাথে মতবিনিময় করা চলতে থাকে এভাবেই। ফেরার পথে এক ক্ষুদে দর্শকের মা, যিনি শিক্ষিকাও বটে, বলেন, আপনাদের সাথে কীভাবে যোগাযোগ করবো? কারণ এই সময়ের বুকে আমার সন্তান, আমার ছাত্রছাত্রী, সকলকে এধরণের সিনেমা দেখাতে চাই বারবার।
মরশুমের প্রথম ছোটদের সিনেমা প্রদর্শনকে ঘিরে তৈরি হয় ভালোবাসা, আর কাজ করার অনুপ্রেরণা। আমাদের অনেক কিছু শেখারও আছে আমাদের ক্ষুদে দর্শকদের থেকে। আমরা একসাথে শিখছিও। মাথায় থেকে যায় চন্দ্রিলার কথা। যে বলেছিল হিংসার ক্ষমতা অনেক বেশি, তবে মুক্তির চাহিদা শেষমেশ জয়লাভ করে।
লাবনী জঙ্গী
ছবি – মুন্তাকেম হক

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *