ক্ষুধার রাজনীতি

গত ২রা ডিসেম্বর যোগেশ মাইম অ্যাকাডেমির প্রেক্ষাগৃহে ছিল পিপল্‌স ফিল্ম কালেকটিভের মাসিক সিনেমা স্ক্রিনিং। দেখানো হল নীলাঞ্জন ভট্টাচার্যর তৈরি তথ্যচিত্র, জোহার। এর সাথে ছিল একটি আলোচনা সভা। বিষয় ক্ষুধার রাজনীতি। অংশগ্রহণকারীরা ছিলেন যথাক্রমে অমৃত পইরা, মানবী মজুমদার এবং নীলাঞ্জন ভট্টাচার্য। আলোচনার সঞ্চালক ছিলেন দ্বৈপায়ন।
আর যেটা প্রতিবারই থাকে, সেটা হল অন্তরালে থাকা কুশীলবদের কিছু প্রাথমিক কাজ, যার তোড়জোড় শুরু হয় দর্শকরা হলে পৌছনোর প্রায় দেড় ঘণ্টা আগে থাকতে।
আলোচনা সভার শুরুতেই দ্বৈপায়ন ক্ষুধার রাজনীতির পরিপ্রেক্ষিত তৈরি করে দেন। স্বাধীনতা-উত্তর সময় থেকেই একের পর এক মন্বন্তর, ক্ষুধা নিবৃত্তির মরণপণ লড়াই ও সার সার মৃত্যুর মিছিল এই ভূখণ্ডকে ক্ষুধার রাজনীতির সাথে একাত্ম করে দিয়েছে। স্বাধীনতা-পরবর্তী খাদ্য আন্দোলন যার এক পরিণতি। সেখানেই শেষ নয়, খাদ্য সঙ্কট, খাদ্যদ্রব্যের মূল্যবৃদ্ধি, রেশন সঙ্কট ইত্যাদি নানা পরিস্থিতিতে উত্তাল আন্দোলনে ফেটে পড়েছেন সাধারণ মানুষ বিভিন্ন সময়ে। আজও খাদ্যের অভাবে প্রাণ যায় শবরদের, আজও লক্ষ লক্ষ মানুষ মিছিল করে উৎপাদিত খাদ্যশস্যের ন্যূনতম মূল্যের দাবীতে। আজও ‘বসন্ত কাটে খাদ্যের সারিতে প্রতীক্ষায়’।
শবররা মরেন, তাই নিয়ে সরকারি মহলে নানা চাপান উতর চলে, সাংবাদিকরা নানা ভাষ্যে খবরের কাগজের পাতা ভরিয়ে ফেলেন। তাও স্পষ্ট হয় না, শবররা মরেন কেন?
সাত জন শবরের মৃত্যুর খবরের গভীরতা বুঝতে তাই ঝাড়গ্রাম অঞ্চলের বাসিন্দা ও দীর্ঘদিনের সমাজকর্মী অমৃত পইরা তুলে ধরেন আরো অনেক বুনিয়াদি প্রশ্ন। শবর কারা? তারা কিভাবে বেঁচে থাকেন? তারা কি খান? তাদের জীবন জীবিকা কিভাবে অতিবাহিত হয়? শহরের বেশিরভাগ মানুষ জানেনই না যে শবর জাতিগোষ্ঠী একটি নয়, দুটি ভিন্ন ভিন্ন গোষ্ঠী। ঝাড়গ্রাম অঞ্চলে থাকেন মূলতঃ লোধা শবর গোষ্ঠী। তাঁদের জীবনযাত্রার সঙ্গে শহরের মানুষরা অনেকটাই অপরিচয়ের দূরত্বে। সেই দূরত্ব কাটাতে পরিচয়ের সেতু তৈরি করেন অমৃত। ওঁরা মূলতঃ জঙ্গল নিবাসী। ওঁরা জঙ্গল থেকেই যাবতীয় জীবন যাপনের সামগ্রী সংগ্রহ করেন, বা করতে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেন। অসম্ভব দক্ষতায় উঁচু শাল গাছে উঠে পড়তে পারেন অবলীলায়। গাছ কেটে বা জঙ্গল থেকে সংগ্রহ করা কাঠ এবং শুকনো পাতা এইসব লোকালয়ে বিক্রি করেই ওঁরা মূলতঃ অর্থ উপার্জন করেন। একগোছা কাঠের বান্ডিল জঙ্গল থেকে সংগ্রহ করে নিয়ে আসতে প্রায় পুরো দিনটাই কেটে যায়। তারপরে সেটা বিক্রি করে ১০০ থেকে ১২০ টাকা আয় হয়। এই রোজগার করে বাড়ি আসতে আরো একদিন লেগে যায়। পাখির মাংস, সাপের মাংস, ছত্রাক বা ছাতু, এইসবই এঁরা খেয়ে থাকেন। বড়রা দিনে দু’বার খান, আর শিশুরা তিনবার খায়। কোন বাড়িতেই স্থায়ী উনুন থাকে না। মহুয়া গাছ এঁদের খুব প্রিয়। মহুয়া ফুল থেকে মদ, ফল শুকিয়ে কিসমিসের মত এবং মহুয়া বীজ থেকে তেল, এভাবেই এঁরা মহুয়া গাছকে ব্যবহার করেন। লতাপাতার ছাউনি করা মাটির বাড়িই ওঁদের বাসস্থান। সরকার থেকে যে পাকা বাড়ি করে দিয়েছে তাতে ওঁরা খুব একটা থাকতে চান না। চাষের জমিও ওঁদের নেই। সবথেকে বড় কথা ওঁরা চাষবাস করতেও খুব একটা চান না। আরেকটা অজানা কথা যেটা শোনালেন, সেটা হল, চার পাঁচ কিলোমিটার জঙ্গল পরিক্রমা করে যা সংগ্রহ করে নিয়ে আসেন তা হল একদিনের খোরাক। শেষ হলে আবার জঙ্গল সংগ্রহে বেরিয়ে পড়া। শহুরে মানুষ যেখানে প্রয়োজনের অতিরিক্ত ব্যবহার করতে করতে প্রয়োজনের মাত্রাই ঠিক করে উঠতে পারেন না সেখানে এই পরিশ্রম-সাপেক্ষ মিতব্যায়ীতা অদ্ভুত ঠেকে বই কি!
লোধা শবরদের জীবন যাপনে শহুরে ধাঁচে চলা সমাজের প্রতি একটা নিরাসক্তি চোখে পড়ে। এই নিরাসক্তিই আসলে তথাকথিত একদর্শী ‘উন্নয়নের মডেল’কে ছুঁড়ে ফেলে দিয়েছে। শহুরে সমাজের মূল রাগ সেখানেই। তাই শবর মরে, কারণ এই উন্নয়নের পরিসরে তার জীবনচর্চা বেমানান। ‘উন্নয়ন’ তার স্বাভাবিক জীবন যাপনের সমস্ত উপকরণ গ্রাস করে নিচ্ছে। তাকে উৎখাত করছে। এভাবেই হয়তো একদিন শবর বলে কোনও জনজাতির অস্তিত্ব বিলুপ্ত হবে। ফলে জঙ্গলের উপরে শবরদের অধিকারের প্রশ্নকে বাদ দিয়ে বা তার ওপর নির্ভরশীল বিকল্প অর্থনীতির প্রসঙ্গকে বাদ দিয়ে শুধু কিছু সরকারি সাহায্য দিয়ে শবর জনগোষ্ঠীর মূল সমস্যা হয়তো মিটবে না।
এই কথকতায় আমাদের সামনে আসলে চলমান কিছু দৃশ্যের জন্ম হচ্ছিল। তাই কথা শেষ হতেই দৃশ্য আর শ্রবণের ব্যবধান অতিক্রমণে এক নৈঃশব্দ্য তৈরি হল।
চলচ্চিত্র পরিচালক নীলাঞ্জনের বক্তব্যে উঠে এল উড়িষ্যা ও ঝাড়খন্ডে বহুদিন ধরে তথ্যচিত্র বানানোর কাজে ঘোরাঘুরির সূত্রে তাঁর কিছু বাস্তব অভিজ্ঞতার কথা। উড়িষ্যার কাশীপুরে বক্সাইটের খনির বিরুদ্ধে সেখানকার আদিবাসী মানুষদের লড়াই-এর কথা। এই প্রসঙ্গক্রমে তিনি ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের একটি খবরের উল্লেখ করে বললেন যে ২৫০০ কোটি টাকা বরাদ্দ হয়েছে জাড়োয়াদের অঞ্চলে রাস্তা বানানোর জন্যে আর তার সাথে জাড়োয়াদের প্রশিক্ষণ দেওয়া হবে নারকেল গাছ তৈরি করে সেখান থেকে জীবন জীবিকা চালানোর উপায় সম্পর্কে। অতীব হাস্যকর বা ভয়ঙ্কর একটি প্রয়াস। নীলাঞ্জন তাঁর অভিজ্ঞতালব্ধ বোধ থেকে জানালেন বক্সাইট শোধনের কারখানা কীভাবে সেখানকার আদিবাসী মানুষদের জীবন ধারণের পরিবেশকে ধ্বংস করে দিচ্ছে। যে ঝরণার জল তাঁরা ব্যবহার করেন সেই ঝরণার জলে মিশছে কারখানা নিঃসৃত দূষিত রাসায়নিক নির্যাস। এই ভাবেই আদিবাসী সমাজ হয়তো ধীরে ধীরে তাদের স্বাভাবিকতা খুইয়ে শহুরে সমাজে মিশে যাওয়ার বা জোর করে মিশিয়ে দেওয়ার ব্যর্থ চেষ্টায় একদিন অন্তর্হিত হবে, আর তাঁদের খাদ্য সম্বন্ধে ও খাদ্য আহরণ সম্বন্ধে গভীর অভিজ্ঞতালব্ধ যে জ্ঞান ভান্ডার, তার কি হবে? যে জীবনযাপন থেকে এই প্রকৃতি-নির্ভর জ্ঞান সেই জীবনযাপন থেকে বিচ্যুতিকে নজরআন্দাজ করে আদিবাসী সমাজের ক্ষুধার প্রশ্নকে বোঝা যায় না নীলাঞ্জনের বক্তব্যে উঠে এলো সেই দিকটাই।
ক্ষুধার রাজনীতির প্রসঙ্গ থেকে আমাদের আলোচনা মূলতঃ চলে গিয়েছিল আদিবাসী সমাজের জীবন এবং খাদ্য সঙ্কটের পটভূমিকায়। সেখান থেকে আবার তা ফিরে এল শহরের ক্ষিদের কথায় – অধ্যাপক ও গবেষক মানবী মজুমদারের ভাষ্যে। তিনি সরাসরি ক্ষুধা নিবৃত্তি এবং খাদ্যের সংস্থানের জন্যে রাষ্ট্রের কী ভূমিকা এবং তার ফল কী তার সম্পর্কে বললেন। সকলের জন্যে খাদ্যের সরবরাহে রাষ্ট্রের প্রয়োজন ২৭,০০০ কোটি টাকা বরাদ্দ, যেটা আপাতদৃষ্টিতে খুব বড় অঙ্ক হলেও আমরা যদি খরচের অগ্রাধিকারের পরিকল্পনা করি, তবে দেখা যাবে কর্পোরেটদের ধার মকুব করতে যে পয়সা খরচ হয় এটা তার তুলনায় কিছুই নয়। এইভাবে রাষ্ট্রের অগ্রাধিকার ঠিক করার যে পদ্ধতি তা আসলে একটি রাজনৈতিক নির্ণয়। এই নির্ণয় যখন সাধারণ মানুষের বা ক্ষুধার্ত মানুষের বিরুদ্ধে যায় তখন তার বিরোধিতাও একান্ত প্রয়োজন। দৈনন্দিন সক্রিয়তায় এই বিরোধিতাকে নিয়ে আসতে হবে। রাষ্ট্রের ভাড়ারে খাদ্য সুরক্ষার নিমিত্তে নানাবিধ পরিকল্পনা রয়েছে, যেমন মিড ডে মিল। কিন্তু অধিকাংশ ক্ষেত্রে এর বাস্তবায়ন হয় ভীষণ অনাদরে এবং বহুরকম ফাঁকির সমাহারে। যার ফলে অপুষ্টির কোন সুরাহা হয় না। মানবী যেখানে জোর দিলেন তা হোল, শুধু খাদ্যের যোগান নয়, তার সাথে সম্মানের প্রশ্নটিও জরুরী। তার ফলে যেহেতু এই সুবিধা শুধু সরকার প্রস্তাবিত নিম্নবিত্ত বা গরিবি সীমার নিচে থাকা মানুষরাই পেতে পারে, এই সিদ্ধান্তটিই আসলে সম্মানের বিষয়টিকে দূরে সরিয়ে দিচ্ছে। সুতরাং সমাজের সমস্ত স্তরের মানুষদেরকেই একটি সর্বজনীন রেশন পরিষেবায় অন্তর্ভুক্ত করার মধ্য দিয়ে এই সম্মানের প্রশ্নটির সুরাহা হতে পারে।
আলোচনার পরে ছিল ‘জোহার’ বলে ছবিটির প্রদর্শনী। ঝাড়খণ্ড অঞ্চলের আদিবাসী জনগোষ্ঠীর খাদ্যাভ্যাস, খাদ্য সংস্কৃতি, এবং তাকে ঘিরে গড়ে ওঠা লোকবিশ্বাস ও সংস্কৃতি কীভাবে বনের অধিকার হরণ ও জঙ্গলের কমে আসার ফলে এখন সংকটের মুখে সেই কথাই সহজ নিপুণতার সাথে উঠে আসে ছবিতে।
অনিন্দ্য দত্ত
ছবি – অনিরুদ্ধ দে

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *