সেরেনডিপিটি

১৭৫৪ সালে একটি চিঠিতে হোরেস ওয়ালপোল উদ্ভাবন করেন এক শব্দের। সেরেনডিপ। স্বর্ণদ্বীপ থেকেই এর উৎপত্তি, শ্রীলঙ্কার প্রাচীন নাম। হয়ত ইয়োরোপীয় নাবিকরা বহু পথ ঘুরে শ্রীলঙ্কা উপকূলে পৌঁছলে সূর্যের আলোয় ঝিকানো দ্বীপকে সোনা দেখার ভ্রমে ওইরকম নামকরণ করেছিলেন। কালে কালে ও শব্দের বিশেষ্য অর্থাৎ সেরেনডিপিটির মানে দাঁড়ায় অপ্রত্যাশিতভাবে ভালো জিনিস পেয়ে যাওয়া বা তার ক্ষমতা। গত রোববার ৭ই অক্টোবর যোগেশ মাইম একাডেমীতে এই প্রতিবেদকেরও খানিক সেই অনুভূতি হয়েছিল পিপলস ফিল্ম কালেকটিভের সৌজন্যে। কলকাত্তাইয়া পুজোর আগাম সমারোহ-ব্যস্ততায় অন্যান্য মাসিক প্রদর্শনীর মত এবারের বার প্রেক্ষাগৃহ কানায় পূর্ণ ছিল না ঠিকই, কিন্তু বিষয় ছিল জ্বলন্ত, বিদারক; আমাদের সমাজ মানসে যা প্রতিনিয়ত ধাক্কা দিয়ে চলেছে, আমরা তা মানি আর নাই বা মানি।
‘শ্যামা সির্ফ ঝাঁকি হ্যায়, দাঙ্গা আভি বাকি হ্যায়’
মূল সিনেমা প্রদর্শনী ও বক্তব্যের আগে পিপল্‌স ফিল্ম কালেকটিভের বন্ধু সংগঠন পিপল্‌স স্টাডি সার্কেলের পক্ষ থেকে একটি ফ্যাসিবাদ বিরোধী ছোট বই ‘শ্যামাপ্রসাদঃ কিছু বাংলা কথা’ প্রকাশিত হল। বইটি প্রণয়ন করেছেন স্টাডি সার্কেলের সদস্য সৌরভ রায়। মাত্র পনের টাকার সেই কৃশ বইতে এত আগুন লুকিয়েছিল কে জানত! ওটুকু বইয়ের এমন বৃহৎ তথ্যসূত্র নজর করলে অবাক না হয়ে পারা যায় না। সৌরভ তাঁর বুদ্ধিদীপ্ত, হাস্যরসে জারিত মনোভাবনায় সকলের সাথে ভাগ করে নিলেন কেন বইখানির এ হেন অবয়ব। ভারতবর্ষ এখন রাজনৈতিকভাবে উত্তর-সত্যের (পোস্ট-ট্রুথ) এক অদ্ভুত সময়ে উপনীত। এখানে প্রতিনিয়ত সত্যি মিথ্যের দেরাজটা গুলিয়ে যাচ্ছে। এখানে ঐতিহাসিক চরিত্র অবান্তর প্রশ্নের মুখে পড়ছে আর অগুরুত্বপূর্ণ কোনও এক কালের নেতারা হয়ে উঠছেন রাজনৈতিক দর্শনের মসিহা। যেমন ভারতীয় জনতা পার্টির ‘জনক’ শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়। তাঁকে কাটাছেঁড়া করেই গড়ে ওঠা এ বইয়ে ঐতিহাসিক সত্যমিথ্যের পর্দা ফাঁস হয়েছে আবার সেই লেখনী গঠিত হয়েছে এমন এক হালকা আড্ডার চালে যা বর্তমানে কেন্দ্রশাসিত রাজনৈতিক দল ও তার আই-টি সেলের চেনা অলংকার। এই মিথ্যাদর্শের কাউণ্টার মতবাদ তুলে ধরতে গেলে একাধারে বিশ্বস্ত তথ্য সূত্রের পাশাপাশি শ্লেষাত্মক হওয়া প্রয়োজন। বইতে সৌরভ তাই হয়েছেন। এবার আমাদের পালা। ফেসবুক থেকে চায়ের আড্ডা, অফিস ক্যান্টিন থেকে লোকাল ট্রেনের কামরা, ক্লাস থেকে ইউনিয়ন রুম, বিয়ে বাড়ি থেকে হোয়াটস্যাপ গ্রুপ, যেখানেই শুনবেন ওদের আই-টি সেলের থেকে রটানো মিথ্যে ‘ইতিহাস’ দিয়ে কেউ রাজা-উজির মারছে তখনই এই ছোট বইগুলোকে ব্যবহার করতে হবে।
‘তারপরে সমস্ত দেশ জুড়ে একটা চোখরাঙানি, একটা মুখ-চেপে-ধরার ভঙ্গী’
মানবাধিকার আন্দোলনের কর্মী-চিন্তক সুজাত ভদ্র আমাদের চেনা মুখ। টিভির সান্ধ্য তর্কে অংশ নেবার বহু আগে থেকেই তিনি সহায় সম্বলহীন মানুষের হয়ে লড়ছেন কারণ ‘গণতান্ত্রিক’ দেশ ভারতবর্ষে আজও সেই লড়াইয়ের প্রয়োজনীয়তা কমে যায়নি, বরং বাড়ছে। আর ভারতবর্ষে মানবাধিকার নিয়ে লড়াই মানে ‘একটা পা জেলের ভেতর আরেকটা পা বাইরে’ রেখে নিরলস কাজ করে যাওয়া, যে কোনও সময় নেমে আস্তে পারে গ্রেপ্তারির খাঁড়া। গত ২৯শে আগস্ট দেশের মানবাধিকার আন্দোলনের প্রথম সারির পাঁচজন দীর্ঘদিনের কর্মী গ্রেপ্তার হয়েছেন বিভিন্ন শহর থেকে। টিভি, খবরের কাগজের দৌলতে সেই নামগুলো আমরা আজ বিস্তারিত জানি- হায়দেরাবাদ থেকে ভারভারা রাও, মুম্বাই থেকে ভেরনন গণজালেস, থানে থেকে অরুণ ফেরেরা, ফরিদাবাদ থেকে সুধা ভরদ্বাজ ও দিল্লি থেকে গৌতম নভলখা। এর ক’দিন আগে আরও এক প্রস্থ ধরপাকড়ে বিভিন্ন শহর গ্রেপ্তার হয়েছেন আরও পাঁচ জন সুপরিচিত অধিকার আন্দোলনের কর্মী। তাঁরা এর আগে কী কাজ করেছেন, কিভাবে সমাজের সর্বহারা মানুষের জন্য দিনের পর দিন লড়ে গেছেন সে খবর এতদিন আমরা না রাখলেও এখন জানি তাঁরা নাকি ‘মাওবাদী ঘনিষ্ঠ’। রাষ্ট্রের যে চক্রান্তে তাঁদের আজ গৃহবন্দী অবস্থা সে খবর আমাদের ভুলিয়ে দেওয়া হয়েছে। এই ‘মাওবাদী’ তকমাটাও ভারী অদ্ভুত। সুজাত নিজ অভিজ্ঞতা ভাগ করে নিচ্ছিলেন যে মাওবাদী হিসেবে যাদের মৃতদেহ পাওয়া যায় তারা আসলে সমাজের ’সারাদিনে একবেলা খেতে পাওয়া’ শ্রেণীর মানুষ। সেই ‘ভয়ঙ্কর’ না-খেতে-পাওয়া মানুষগুলোর থেকে ‘বাঁচতে’ ‘অসহায়’ পুলিশকে গুলি চালাতে হয় অথচ সেই গুলি চালনার ক্ষত আবিষ্কৃত হয় তাদের পিঠে! যে সব আইনের সাহায্যে রাষ্ট্র মানবাধিকারের টুঁটি চেপে ধরে সে সব সম্বন্ধেও সুজাতবাবু বললেন। প্রথমে ছিল টাডা। তাতে গ্রেপ্তার ৬২,০০০ মানুষের মধ্যে ৬০,০০০ মানুষই নির্দোষ প্রমাণিত। তারপর এল পোটা। ২০০০ সালে। ২০০৪-এর যে অধিবেশনে পোটা বন্ধ হল সেই একই অধিবেশনে দুপুর ৩টের সময় পাশ হয়ে গেল নতুন আইন ইউএপিএ। স্বয়ং সুপ্রীম কোর্ট যে আইন সম্বন্ধে বলেছেন, একবার এই আইনের আওতায় ‘বুক’ হলে জামিন পাওয়া প্রায় অসম্ভব। সব থেকে আশ্চর্য, এ আইনে গ্রেপ্তার হলে অভিযুক্তকে নিজেকেই নির্দোষ সাব্যস্ত করতে হবে।
সুজাত সত্তরের জরুরি অবস্থার কথা মনে করিয়ে দিয়ে উল্লেখ করলেন আজকের ভারত রাষ্ট্র সে সময়ের থেকে কিছু আলাদা নয়, বরং আরও সাংঘাতিক। রাষ্ট্রের মনমতো না চললেই গ্রেপ্তার, অত্যাচার এবং ‘মাওবাদী’ বা ‘আরবান নক্সাল’ বলে দেগে দেওয়া হচ্ছে। আধ ঘণ্টা সময়ে এত গভীর ও বৃহৎ বিষয় সম্বন্ধে আলোকপাত কঠিন তবু বক্তার সহজাত সরল বলার ভঙ্গিতে খানিকটা পরিষ্কার হল আমাদের বহু প্রশ্ন। পরিশেষে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ১৯২২ সালে কালিদাস নাগকে লেখা একটি চিঠির উল্লেখ করে সুজাত শেষ করলেন; যে সময়ে চরকা কেটে সবাই স্বরাজ গড়ে তোলার স্বপ্নে মশগুল। কেউ অন্যভাবে ভাবলেই তার দিকে বাঁকা চোখে তাকানো। আর দেশজুড়ে তখন ‘একটা চোখরাঙানি, একটা মুখ-চেপে-ধরার ভঙ্গী’।
‘দ্য অ্যাডভোকেট’
কে জি কন্নাবীরন অন্ধ্রপ্রদেশের নাগরিক অধিকার ও গণতান্ত্রিক অধিকার রক্ষা আন্দোলনের ক্ষেত্রে এক অভূতপূর্ব নাম। ষাট বছরেরও বেশি সময় ধরে এই দেশের ত্রি-স্তরীয় কোর্ট ব্যবস্থার মধ্যে দেশের নাগরিকদের পক্ষ নিয়ে রাষ্ট্রীয় নিপীড়নের বিরুদ্ধে লড়াই করে দেশের দেশের সংবিধানকে দেশবাসীর পক্ষে টেনে আনায় তাঁর ছিল অবিস্মরণীয় ভূমিকা। এমন লড়াকু জীবন নিয়ে ছবি তৈরি করেছিলেন দীপা ধনরাজ। দীপা নিজেও ভারতবর্ষে তথ্যচিত্র করিয়েদের মধ্যে এক উজ্জ্বল নাম। কন্নাবীরনের জীবন ও লড়াইয়ের পাশাপাশি যে অমোঘ প্রশ্ন এ কাজের মধ্যে দিয়ে তিনি তুলে আনেন তা আর কিছু নয় গণতান্ত্রিক অধিকার রক্ষা আন্দোলনেও লিঙ্গ ভেদের প্রছন্ন ইতিহাস। ছবিটি দ্রুত গতির নয় এবং সাক্ষাৎকার-আকীর্ণ কিন্তু বক্তব্যের দৃঢ়তায় অসম্ভব বলশালী। সব থেকে বড় কথা কে জি কন্নাবীরন ও তাঁর সহযোদ্ধা ও স্ত্রী বসন্ত কন্নাবীরনের লড়াই আজকের গণতান্ত্রিক অধিকার রক্ষার আন্দোলনকারী নেতা নেত্রীদের ওপর রাষ্ট্রীয় নিপীড়নের সাথে যেন এক হয়ে যায়। মাঝখানের এত বছরে এ গণতান্ত্রিক ভারতে তাহলে কিছুই বদলাল না!
‘শ্যামাপ্রসাদঃ কিছু বাংলা কথা’ বইটির লোকার্পণ, সুজাত ভদ্রের কথোপকথন এবং পরিশেষে দীপা ধনরাজের তৈরি সিনেমা দিয়ে যে সন্ধ্যে গত ৭ই অক্টোবর যোগেশ মাইম একাডেমীতে একসাথে কাটল তা শুধু ভারতবর্ষের বর্তমান বাস্তব সম্বন্ধে আমাদের সচেতন করলো তাই নয় আমাদের আগামীর লড়াইয়ের রসদ হয়ে রইল নিঃসন্দেহে।
ছবিঃ অনিরুদ্ধ দে
ভাস্কর মজুমদার

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *