নাগরিকপঞ্জি, বিপন্...

গত রবিবার (৯ই সেপ্টেম্বর) পিপল্‌স ফিল্ম কালেকটিভের উদ্যোগে যোগেশ মাইম অ্যাকাডেমিতে অনুষ্ঠিত হলো ‘ফল্ট লাইন আসাম’ শীর্ষক সাংস্কৃতিক সভা। ছিল একটি পুস্তিকা প্রকাশ, আলোচনা আর তথ্যচিত্র প্রদর্শন, সবই আসাম এবং তার বর্তমান পরিস্থিতি সংক্রান্ত। বক্তা, অধ্যাপক দেবর্ষি দাস, উপস্থাপন করেন আসামের বর্তমান পরিস্থিতি অর্থাৎ নাগরিকপঞ্জি (এন-আর-সি) এবং প্রব্রজন (মাইগ্রেশন) নিয়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা। তাঁর নিজের অভিজ্ঞতা এবং সংগৃহীত তথ্য সহযোগে স্পষ্ট করে দেন এই নাগরিকপঞ্জি তৈরির পেছনে থাকা রাজনীতি ও রাষ্ট্রীয় চক্রান্ত এবং সাধারণ শ্রমজীবী মানুষের সামনে আসা ব্যাপক সংকট। এই আলোচনা শুরু হওয়ার আগে প্রকাশিত হয় পিপল্‌স স্টাডি সার্কেল এর প্রকাশনায় দেবর্ষি দাসের লেখা ছোট বই, ‘আসামে নাগরিকপঞ্জির সাতকাহন’।

‘আসামে নাগরিকপঞ্জির সাতকাহন’
আলোচনায় স্বাধীনতা-পূর্ব সময় থেকে স্বাধীনতা-উত্তর সময়ে আসামে যে প্রব্রজন ঘটে তার প্রাসঙ্গিকতা এবং তার সাথে খেটে খাওয়া সাধারণ মানুষের অবস্থান বাঙ্ময় হয়ে ওঠে। কীভাবে ব্রিটিশ শাসক আসাম থেকে তার সম্পদ লুট বজায় রাখার জন্যে ভারতবর্ষের নানান প্রান্ত থেকে উপড়ে আনা মানুষকে তাদের ইচ্ছার বিরুদ্ধে আসামে চালান করে তার বর্ণনা। তারপর ঘটে দেশভাগ। একদল মানুষ ভিটে-মাটি-চ্যুত হয়ে প্রাণের দায়ে আসামে এসে হাজির হয়। এভাবেই আস্তে আস্তে আসামে অহমিয়াভাষী ও বাংলাভাষীর সংখ্যা বদল হতে থাকে, আর তার সাথে গড়ে উঠতে থাকে অহমিয়া জনজাতিগুলির বিলুপ্ত হয়ে যাবার আশঙ্কা। যা ক্রমশঃ জন্ম দেয় ক্ষোভ। আবার পরবর্তীতে এই ক্ষোভকে কাজে লাগিয়ে অহমিয়া মধ্যবিত্তের নেতৃত্বে গড়ে ওঠে আসাম আন্দোলন। যারই পরবর্তী ফলশ্রুতিতে অনেক ঘাটের জল পেরিয়ে শেষে এই নাগরিকপঞ্জির নবীকরণ। এরই মধ্যে ঘটে গিয়েছে নেলি সহ অন্যান্য হত্যাকান্ড। নেলিতে সরকারি হিসেব মতে প্রায় ২০০০ মানুষ নিহত হয়। এই হতাহতদের অধিকাংশই বাংলাভাষী মুসলমান চাষি ও খেতমজুর। এই সাম্প্রদায়িক হানাহানির সূত্র ধরেই আসামে বিজেপির অভ্যুদয় এবং আজ নাগরিকপঞ্জির মধ্য দিয়ে তার বিভাজনের রাজনীতির রূপ প্রকাশিত। যান্ত্রিক গোলযোগের কারণে বক্তার তৈরি করা স্লাইডগুলি সম্পূর্ণ দেখানো যায়নি। কিন্তু দর্শকদের তাতে কোনও সমস্যা হয় নি। তারা শুনেছেন, বুঝেছেন এবং বক্তব্যের পর বহুক্ষণের আদানপ্রদানে অংশগ্রহণ করেছেন স্বতঃস্ফুর্ত ভাবে।
এরপর প্রদর্শিত হয় নেলি হত্যাকান্ডের পটভূমি ও সেই হত্যাকান্ডের অন্তঃসলিলা স্মৃতি নিয়ে শুভশ্রী কৃষ্ণনের তৈরি করা তথ্যচিত্র, ‘হোয়াট দ্য ফিল্ডস রিমেমবার’। ছবিটি তৈরি হয় ঘটনাটি ঘটে যাবার প্রায় ৩০ বছর পরে। তাই ঘটনাটিকে খুঁজে নিতে ক্যামেরাকে দাঁড়াতে হয়, অপেক্ষা করতে হয় মাঝে মাঝে। বিছানায় পড়ে থাকা প্রায় অস্পষ্ট ছবি থেকে স্মৃতিচারণ করতে গেলে তাকে তো কিছুক্ষণ থমকে থাকতেই হবে। এতগুলি দশক ধরে ন্যায়বিচারের কাঁটা যেমন থমকেই থেকেছে। ত্রিশ বছর সময়ের বিস্মৃতির পুরু আচ্ছাদন ভেদ করে ক্যামেরা খুঁজে চলে সেইসব উপাদান, যাকে জড়ো করে একটা ঘটনাকে পুনর্গঠন করা যায়। এই ভাবেই সে বের করে আনে, সিরাজুদ্দিন আহমেদ-কে, আব্দুল খায়ের-কে, যাঁরা আমাদের নিয়ে গিয়ে দাঁড় করান সেই মানবিকতা হত্যার দৃশ্যপটের সামনে। আমাদের মননে একের পর এক ভেসে ওঠে বীভৎস দৃশ্যগুলি। এক দীর্ঘ মরমী কথোপকথন আমাদের সামনে আস্তে আস্তে মেলে ধরে সেই ভয়ঙ্কর দিনগুলির কথা। ক্যামেরার শান্ত দৃশ্যপট, বৃষ্টিধোয়া সবুজ ধানের ক্ষেত, মননের পর্দায় তখন রক্তমাখা আকাশ, ক্ষেতের নিচে গণকবরে কৃষকশিশুর শব। জলা জমি, পশ্চাৎপটে হালকা নীল পাহাড়, এর মধ্যে ক্যামেরা স্থানু হয়ে প্রার্থনার ভঙ্গীতে দাঁড়িয়ে থাকে। ভুলে যাওয়া বিচার-প্রক্রিয়ার কাঠগড়ায় ওই মাঠগুলির জলকাদামাখা সাক্ষী হয়ে। কবরে যাওয়া অবধি ভারত সরকারের কাছে ন্যায় দাবি করবেন ঘোষণা করেন অশীতিপর সিরাজুদ্দিন। আল্লার বিচারের উপর বিশ্বাস হারান না বৃদ্ধ আবদুল, শুধু উত্তর খোঁজেন কেন এই হত্যা, কেন মানুষই মানুষকে হত্যা করে? আর আমরা বাড়ি ফিরি সেই অমোঘ প্রশ্নকে নিয়ে, ‘কত হাজার মরলে তবে মানবে তুমি শেষে, বড্ড বেশি মানুষ গেছে বানের জলে ভেসে’।
And the answer, my friend, is blowin’ in the wind…the answer is blowin’ in the wind…
অনিন্দ্য দত্ত
স্থিরচিত্র- অনিরুদ্ধ দে

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *