কৃষি সংকটের হকিকত

কবিতা বেহল ও নন্দন সাক্সেনার ‘কটন ফর মাই শ্রাউড’ ছবিটা তৈরি হয়েছিল ২০০৬ সালে। মহারাষ্ট্রের তুলো চাষীদের আত্মহত্যার কারণ খুঁজতে গিয়ে বিদর্ভের গ্রামগুলো ঘুরে ছবিটা বুঝতে চেয়েছিল মনসান্টো সংস্থা-সরকারের মধ্যেকার জোট ও কৃষকদের ওপর তাদের অন্তহীন শোষণকে। ছবিটা যদিও শুধুমাত্র বিদর্ভের তুলো চাষীদের গল্প না হয়ে সারা দেশের চাষীদের বারোমাস্যা হয়ে উঠেছে। গত শনিবার, ২১ শে এপ্রিল, যোগেশ মাইম একাডেমিতে, পিপল্‌স ফিল্ম কালেকটিভ আয়োজিত অনুষ্ঠানে, এই ছবিটা ছাড়াও দেখানো হল ম্যাথু রায়ের তৈরি নতুন ছবি ‘ডিজপজেসড’। দুই ছবির মাঝখানে আলোচনায় ছিলেন অর্থনীতির শিক্ষক-গবেষক শুভনীল চৌধুরী ও প্রাকৃতিক কৃষক অপরাজিতা সেনগুপ্ত।
সম্প্রতি মধ্যপ্রদেশের মন্দসৌরে আন্দোলনরত কৃষকদের ওপর বিজেপি সরকারের গুলি চালিয়ে হত্যার এক বছরের মধ্যেই মহারাষ্ট্র, মধ্যপ্রদেশ, রাজস্থান ইত্যাদি অঞ্চলে কৃষকদের ব্যাপক সাড়া জাগানো গণআন্দোলন কৃষি সংকট ও কৃষকদের সমস্যাকে আরও একবার সামনে নিয়ে এসেছে। যে কর্পোরেট মিডিয়া হাউসগুলো সাধারণতঃ কৃষকদের সমস্যাকে ভুলে ও ভুলিয়ে থাকে তারাও বাধ্য হয়েছিল মহারাষ্ট্রের লং মার্চ নিয়ে খবর করতে। যদিও এখন তারা এই প্রসঙ্গটি ভুলে দ্রুতই অন্য প্রসঙ্গে চলে গেছে, কারণ আমাদের কর্পোরেট মালিকানার মিডিয়ার স্বাভাবিক ধর্মই হল সমস্ত মৌলিক কাঠামোগত সমস্যাকে ভুলিয়ে কেবল প্রসঙ্গ পাল্টাতে পাল্টাতে মৌলিক বিষয়গুলো থেকে দৃষ্টি সরিয়ে যাওয়া। এখনও অবধি রাজস্থান ও মহারাষ্ট্রের আন্দোলনরত কৃষকদের ভাগ্যে প্রতিশ্রুতি ছাড়া কিছুই জোটেনি। তাই আন্দোলন জারি আছে। কিন্তু, যে দেশে প্রতি আধ ঘন্টায় একজন কৃষিজীবি আত্মহত্যা করেন সেখানে এই ঘুরে দাঁড়ানোটাও বড়ো খবর। আশার খবর।
ছবি দু’টো থেকে এবং সঙ্গের আলোচনা থেকে কৃষি সংকটের যে চিত্র উঠে এলো তা যদিও ততটা আশার নয়। আমাদের দেশে সবুজ ‘বিপ্লব’ পরবর্তী সময়ে দ্রুত ফলন বাড়ানোর নাম করে যে নিদান দেওয়া হয়েছিল তা শুধু জমির উর্বরতাকে দীর্ঘমেয়াদী ভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করছে তা-ই নয়, বীজ-সার-সেচ-বাজারের ওপর থেকে কৃষকের নিয়ন্ত্রণকে সম্পূর্ণ কেড়ে নিয়েছে। যেহেতু এই কেড়ে নেওয়াটা জমি উচ্ছেদের মতো সরাসরি নয় তাই এটা হয়ত বা আরও খতরনাক। জমি উচ্ছেদের ফলে যে মানবিক মূল্য দিতে হয়, তা আমরা দেখতে পাই। বুঝতে পারি। অনেক ক্ষেত্রেই কারখানা-খনির জন্য জমি কেড়ে নেওয়ার বিরুদ্ধে আন্দোলন রক্তক্ষয়ী হয়েছে। সরকার বদলেছে জোর করে জমি দখল করতে গিয়ে। কিন্তু, কৃষি সম্পদ, কৃষি উপকরণের ওপর কৃষকের নিয়ন্ত্রণকে হটিয়ে বাজারের নিয়ন্ত্রণ কায়েম যেহেতু বাজারের নিয়ম মেনে – অর্থাৎ ‘ফ্রি মার্কেটে’ ‘ফ্রি চয়েস’ দেওয়ার নিয়ম মেনেই হয়েছে তাই আমরা যারা কৃষিপণ্যের ক্রেতা হিসেবে দূর থেকে কৃষি সমস্যাকে বুঝি তারা শুধু শুনে গেছি প্রত্যেক আধঘন্টায় দেশে একজন কৃষক আত্মহত্যা করেন, কিন্তু এই লুঠের রাজনীতি-অর্থনীতিকে তলিয়ে বুঝতে বা প্রতিরোধ করতে চেষ্টা করিনি।
‘ডিসপজেসড’ ছবিতে পি-সাইনাথের এক সাক্ষাৎকারে উনি বলেন যে সমস্ত ধর্মের মতো নব-উদারবাদও এক ধর্ম। সে আরও দশটা ধর্মেরও বাপ। যার আছে নিজস্ব পোপ ও পূজারী। আছে অসংখ্য টেলি-এভাঞ্জেলিস্ট। যারা প্রত্যেক সন্ধ্যেবেলায় টিভি স্টুডিওয় বসে পড়েন তাদের বাণী দিতে। এই ধর্মের আছে নিজস্ব গসপেল। বাজারের এই অন্তহীন যাত্রা যা আমাদের ভুলিয়ে দিতে পেরেছে এই নতুন ধরণের কর্পোরেট-নিয়ন্ত্রিত কৃষিব্যবস্থা কেবলমাত্র কৃষকদের জন্য ক্ষতি আর লোকসান বয়ে নিয়ে আসছে তাই নয়, তা মাটির ঊর্বরতাকে, জলস্তরকে, বীজের বৈচিত্র্যকে, আমাদের দেশ তথা সারা বিশ্বের দরিদ্রতম মানুষদের খাদ্যাভ্যাস ও খাদ্য-সুরক্ষাকে স্থায়ীভাবে বিপন্ন বা নিকেশ করে দিচ্ছে; যার ফলে বিশ্বের কৃষি-কর্পোরেটগুলি এখন হামলে পড়ছে আফ্রিকার মাটির দখল নিতে। যেখানে মাটির উপরিভাগ বা টপ-সয়েল এখনো অপেক্ষাকৃতভাবে ঊর্বর।
ভারতের মতো দেশে যেখানে কোনো দিনই ভূমি সংস্কার সম্পূর্ণ হয় নি, সেখানে কৃষি উপকরণ ও বাজারের ওপর দেশি-বিদেশী কর্পোরেশনগুলোর সর্বগ্রাসী নিয়ন্ত্রণের ফল হয়েছে ছোটো কৃষকদের ওপর এক অদৃশ্য মারণ-জোয়াল চাপিয়ে দেওয়া। ভূমি সংস্কারের উলটো পথে যাত্রা। কিন্তু, একদিকে ছোটো ও মাঝারি কৃষকের উপস্থিতি ও উপকরণ ও বাজারের ওপর পুঁজির নিয়ন্ত্রণ ভারতের কৃষকদের সমস্যাকে জটিল করে তুলেছে। অন্যদিকে জৈব চাষের পরিসরেও কর্পোরেটরা ঢুকে পড়েছে। কোম্পানিরা জৈব সার বিক্রি করছে। যার মূল মন্ত্র হলো সাধারণ গরীব শ্রমজীবি মানুষদের জন্য বিষযুক্ত চাষ আর গুটিকয়েক অসাধারণ মানুষদের জন্য সতেজ ‘অরগ্যানিক’ সবজি ও শষ্য। এও এক শ্রেণী বিভাজনের রাজনীতি। অথচ প্রাকৃতিক কৃষি-পদ্ধতির মাধ্যমে, ভূমি সংস্কার সম্পূর্ণ করা ও কো-অপারেটিভ চাষের মাধ্যমে, কৃষিতে সরকারি সাবসিডি বৃদ্ধির মাধ্যমে, সার-বীজ-সেচ-বিদ্যুৎ-ব্যাঙ্কলোন-কোল্ডস্টোরেজ-বাজার-কৃষিপণ্যের দাম সমস্তটার ওপর কৃষকের সমবেত নিয়ন্ত্রণ ও দরাদরির ক্ষমতা ফিরিয়ে আনার জন্য যে কৃষিব্যবস্থাকে ঢেলে সাজানো দরকার সে কথা মানুষকে জানতে বা বলতে দেওয়া হচ্ছে না।
এর বিপ্রতীপে, প্রাকৃতিক চাষ সম্পর্কে সচেতনতা ও এই চাষের নিজস্ব বাজার তৈরি জন্য তাই স্বেচ্ছাশ্রমের প্রসঙ্গ উঠে আসলো আলোচনায়। শহরের মানুষের খাদ্যের যোগানের ক্ষেত্রে প্রথম ধাপ হিসেবে শহরের বর্জ্যের প্রাকৃতিক উপাদানকে বিষমুক্ত অবস্থায় মাটিতে ফিরিয়ে দেওয়া নিয়ে নতুন করে ভাবার প্রয়োজন নিয়ে কথা এল। শহরের চাষ প্রসঙ্গে হাভানার মডেল ও বিকল্প বাজারের প্রসঙ্গে আমেরিকার ফার্মার্স মার্কেট আন্দোলনের প্রসঙ্গ এল। কিউবা-র কৃষি মডেলের পাশাপাশি উঠে এল মিনিমাম সাপোর্ট প্রাইস-ফিউচার ট্রেডিং-এর রাজনীতি-অর্থনীতি নিয়ে কথাবার্তা।
কৃষকদের লড়াই চলবে। কৃষিব্যবস্থাকে বদলানোর লড়াই চলবে। কারণ, সব অর্থেই এ লড়াই বাঁচার লড়াই। এবং, এ লড়াই সবার লড়াই।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *