লিটল সিনেমা ডায়েরি...

লিটল সিনেমার পক্ষ থেকে বিগত কয়েক বছর ধরে আমরা নিয়মিত চেষ্টা চালাচ্ছি আমাদের গ্রাম-শহরের শিশু-কিশোর বন্ধুদের মাঝে পৌঁছে যেতে। এই দুঃসময়ে দাঁড়িয়ে তাদের সাথে ভাগ করে নিতে সিনেমা দেখার আনন্দ। যে অভিজ্ঞতার মাধ্যমে হয়তো তারা শিখে নিতে পারবে আমাদের চারিদিককে প্রশ্ন করার প্রয়োজনীয় অভ্যেস।
কাজটা যে খুব সহজ, তা নয়। কারণ মানুষের চেতনা ও অভ্যাসের মধ্যে ‘বিনোদন’ শব্দটার অর্থ ধর্ম-রাষ্ট্র-বাজারের জোট এমনভাবে বদলে দিতে পেরেছে, যে আমরা যখন এখানে অন্য রকম সিনেমা দেখাতে যাচ্ছি, তখন তাদের চেনা-জানা সিনেমার সাথে তার পার্থক্য বিস্তর। ফলে অপরিচয়ের সামান্য দ্বিধা বা নতুন ধরণের সিনেমার সাথে পরিচয়ের প্রাথমিক সংকোচ কাটানোটাও কাজের অংশ হচ্ছে। তা সত্ত্বেও আমাদের অবাক করে এমন অসংখ্য প্রতিক্রিয়া পাচ্ছি যা থেকে বোঝা শক্ত নয় যে আমাদের ছোটো বন্ধুরা নিজেদের জীবনের সাথে দেশ বিদেশের এই সিনেমাগুলির মিলও যে পাচ্ছে না তা নয়। আর তাই তাদের জানা-বোঝা আমাদেরও প্রতিনিয়তই অনেক কিছু নতুন করে শেখাচ্ছে।
গত ৯ ও ১০ মার্চ মুর্শিদাবাদের পাঁচগ্রামে আমরা এমনই কিছু শেখার ও শোনার চেষ্টা করেছি। বহরমপুর থেকে এক ঘণ্টা দূরত্বে পাঁচগ্রাম, বাংলার আর পাঁচটা গ্রামের মতোই। সেখানকার মানুষের জীবনে অলাভজনক চাষ-আবাদ আছে, জীবিকার তাগিদে শ্রমিক পরিযায়ন আছে, চাকুরিহীন মানুষের বেঁচে থাকার তাগিদ থেকে ছোট ছোট ব্যবসা, মুদির দোকান, বিড়ি-বাঁধা এসবই আছে। একই সাথে এই গ্রামে নব্বই শতাংশের ঘরে টিভি আছে, টিভিতে বাহুবলী, সাল্লুভাই, আর দাদা-দিদি আছে। বাইক বিক্রির বাজার তৈরির জন্য পাকা রাস্তাও আছে। অসম্ভব নিরাশা মুক্তির জন্য মোড়ে মোড়ে এখন বাংলা মদের দোকানও আছে। এসব থাকা ‘স্বাভাবিক’ হয়ে ওঠার সাথে, একটা বড্ড ‘অস্বাভাবিক’ বিষয় আজও চোখে পড়ে এই গ্রামে। বিকেল চারটের পর থেকে বাজারগুলোতে অসংখ্য জটলা বাঁধা তাসের আসর। পূর্বজদের সময় থেকে চলে আসা এই বিনোদনটিকে বাজার এখনো গিলে খেতে পারেনি। কাজের শেষে এই হিন্দু-মুসলমান (পুরুষেরা) একসাথে বসে নিয়মিত তাস খেলেন। নন্দগোপালের প্রিয় তাস খেলার পার্টনার গরু জবাই করেন; তারা এক সাথে বসে তাস পেটান, চা, মুড়ি, তেলেভাজা, আর সুখ-দুঃখ ভাগ করে নেন। কোন প্রশ্ন ওঠে না, ধর্ম নিয়ে। কিন্তু এর মধ্যেও কেউ বলে ওঠেন আজকাল পরিস্থিতিটা বদলাচ্ছে, বেশি বেশি জলসা আর হরিনামের আসরে এই পরিস্থিতিটা বদলাচ্ছে। কিছু পাড়ায় যুবকদের মধ্যে একটি রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘের শাখা খুলেছে বলে শোনা গেল।
তবে সংঘ যদি প্রতিটা গ্রামে এভাবে ঢুকতে পারে, আমরাও পারি। ওরা যদি হিংসা চায়, আমরা প্রেম চাইবো। আজও বিশ্বাস করি আমরা মানুষের বেঁচে থাকার লড়াই-এর মধ্যে আদিম সৌন্দর্য আর প্রেম লুকিয়ে আছে। কিছু পাঠ্যবই-লেখক তথা ক্ষমতাবানেরা যদিও মানুষের আদিম রিপু-হিংসা নিয়েই বেশি কথা বলে। সত্যিটা অন্য। তাই ক্ষেতে ধান কাটতে কাটতে মাটির মানুষেরা গান বাঁধেন;
… ও মন আপন ঘরের মাটি… মন চিনে নেও রে…
ও মন জাইনে নেও রে, আমার আল্লাহ কেমন জন
আপনা দেহের মাঝে আছে নিরঞ্জন
মন চিনে নেও রে…
ভাইরে ভাই,
নানা রঙের গাভীন রে ভাই, একই রঙের দুধ,
হিন্দু মুসলিম আছেন যতো রে… ভাই রে একই মায়ের পুত
ও মন একই মায়ের পুত… মন চিনে নেও রে…
বাজারি মিডিয়া আমাদের এক বীভৎস বিনোদন মোহের মধ্যে দিয়ে যখন হিংসার বিস্তারে প্রণোদিত করবে, আমাদের পৌঁছে যেতে হবে আমাদের মাটির গান, মানুষের সিনেমা, নাটক নিয়ে। পাঁচগ্রামে ছোটদের সিনেমা ও সন্ধ্যাবেলা ছোটয়-বড়োয় মিলে ‘তুরুপ’ দেখানো এই কাজেরই অংশ।
পাঁচগ্রাম হাই স্কুল আর পাঁচগ্রাম গার্লস স্কুলের পড়ুয়াদের জন্য হাই স্কুলের অডিটোরিয়ামে গত ৯ আর ১০ মার্চ বসেছিল লিটল সিনেমার আসর। আমরা সিনেমা দেখানোকে ভাগ করে নিয়েছিলাম চার ভাগে। প্রথম দিন ছিল ছেলেদের জন্য সিনেমার আসর। আর পরের দিন মেয়েদের আসর। দু’দিনই, দশটা থেকে একটা ছিল ক্লাস ফাইভ থেকে সেভেনের পড়ুয়াদের জন্য, আর দুটো থেকে পাঁচটা ছিল এইট থেকে ইলেভেনের পড়ুয়াদের জন্য নির্দিষ্ট।
প্রথম দিন প্রথম পর্বে ৭০০ জন ছাত্র এসে জমা হয় স্কুলের প্রেক্ষাগৃহে। আমরা লিটল সিনেমার চারজন ও একজন শিক্ষক মিলে এত ছেলেদের সিনেমা দেখাতে গিয়ে একটু হিমশিম যে খাইনি তা নয়। কিন্তু, তা ছাপিয়ে আমাদের অবাক করে দেয় কয়েকজন পড়ুয়ার সিনেমা পরবর্তী কথোপকথন। পরের ভাগে ক্লাস এইট থেকে ইলেভেন-এর প্রায় ৩৫০ জন ছাত্রের প্রতিক্রিয়া আমাদের কাছেও প্রত্যাশিত ছিল না। শুভাশিস দা-র পরিচালনায় সিনেমাগুলো দেখার পর, ছাত্রদের সাথে মিলে বিশ্লেষণগুলো ছিল আমাদের কাছে এক বড়ো প্রাপ্তি। যে সময়ে দাঁড়িয়ে আমরা ভেবে ফেলেছি গ্রামের বিনোদনের সংজ্ঞাটা হয়তো বা বরাবরের জন্য বদলেই গেছে তখন বিকল্প বিনোদনের সংস্কৃতিতে পাঁচগ্রাম বয়েজ স্কুলের ক্লাস এইট-ইলেভেনের ছাত্ররা যে আগ্রহ দেখিয়েছে, তা আমাদের আশা জোগায়। ভরসা জোগায়।
পরের দিনটি ছিল মেয়েদের। এই ছোটদের সিনেমা উৎসবের দ্বিতীয় দিনটা আমাদের নিজেদের কাছেও ছিল অনেক কিছু শেখার দিন। জানার দিন। ক্লাস ফাইভ থেকে সেভেনে পড়া প্রায় ৬০০টি মেয়ে কি অপূর্ব স্থিরতা ও মনোযোগের সাথে সিনেমাগুলো দেখলো,আর সেগুলো নিয়ে নিজেদের মতামত রাখলো। পরবর্তী পর্বের, ক্লাস এইট থেকে এগারো ক্লাসের ছাত্রীরা সিনেমার পরে যে কথাগুলো বলছিল সেগুলোও ছিল অনুপ্রেরণার। ভরসার। সত্যজিৎ রায়ের দুই দেখে বাঁশি-বাদক ছেলেটির পক্ষ নেওয়া। চান্দা কে জুতে সিনেমায় অবচেতনে কখন চান্দাকে নিজেদের মধ্যেকার একজন করে তোলা। মহীনের ঘোড়ার রাবেয়া-রুকসানাদের মতো জাদুকরের মায়াতে না হারিয়ে যাবার প্রতিজ্ঞা। প্রতিবেশী নামক সিনেমার সাথে নিজেদের গ্রামের সীমান্তের জমি বিবাদকে উল্লেখ করে এই সিনেমার পরিণাম বিশ্লেষণ করা। খুদে সন্ত্রাসবাদী সিনেমাতে নিজেদের ভিন্ন ধর্মের সহাবস্থান ও মানবিকতা,আর প্রেম যে সবশেষে জিতে যায় তার উল্লেখ করা। দুই এবং দুই সিনেমা শেষ বিচারে আসলে মৃত্যুর সামনে দাঁড়িয়ে আসল মানুষের সত্যিটাকে বলে তা উল্লেখ করা। প্রতিটা সিনেমার পর সমবেত প্রতিক্রিয়া সহ ব্যক্তিগতভাবে এতো সংখ্যক মেয়েরা উঠে এই রকম নানান ভাবে সিনেমাগুলোকে নিজেদের জীবনের সাথে জুড়ে বিশ্লেষণ করলো, যা আমাদের কাছে এক নতুন ধরণের পাঠ হয়ে রইলো।
যে সময়টা জুড়ে আমাদের আশংকাগুলো ঘনীভূত হচ্ছিল, সেই সময়ের বুকে পাঁচগ্রামে এই দুই দিন ব্যাপী ছোটদের সিনেমা উৎসব যেন বা এক নতুন পথের সন্ধান দিল। শেষ দিনের অভিজ্ঞতা আমাদের মনে হয় একটা সূত্রও দিল! যদি দুনিয়া বদলের লড়াই শুরু হয় সেখানে এই মেয়েদের ভূমিকা সব থেকে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে। কারণ, আজও এই গ্রামগুলোতে মেয়েদের অনুভূতিগুলো,তাদের লড়াইয়ের প্রশ্নগুলোকে পুঁজিবাদ সম্পূর্ণ বোকাবাক্সে ভরে দিতে পারেনি। তারা রঙিন পাখির মতো উড়বার স্বপ্ন দেখে, শুধু বাজপাখী হয়ে উঠবার ক্ষেত্রটা প্রস্তুত করলেই হবে।
এই সিনেমাগুলো যখন মুর্শিদাবাদের প্রত্যন্ত গ্রামে প্রদর্শিত হচ্ছে, বা লেখাটা যখন লিখছি; আমাদের থেকে অনেক অনেক দূরে এক বিশাল কৃষক আন্দোলন গড়ে উঠতে দেখা যাচ্ছে। পশ্চিমবঙ্গে কৃষকদের যৌথ লড়াই কবে গড়ে উঠবে জানা নেই! তবে গ্রামে তাসের আসরে বিজয় মালিয়া, ললিত মোদী, নীরব মোদী নিয়ে উষ্মা আছে। এখনো একসাথে অধিকার সমেত বাঁচার স্বপ্ন দেখেন। সংঘীরা এই স্বপ্নগুলো ভাঙার প্রতিনিয়ত শক্তিশালী ষড়যন্ত্র করে যাচ্ছে। আমাদের দীর্ঘমেয়াদি বিকল্প লড়াইয়ের ময়দান তৈরি করতে দুর্বলতা আর তার সুযোগে পুঁজিবাদী বাজার, রাষ্ট্র একসাথে মিলে আমাদের পিষে দেবার আগে আমরা কি পারি না গ্রামে গ্রামে এই ভাবে পুঁজিবাদী বিনোদনের বিকল্প বিনোদন তৈরি করতে?
ফেরার পথে মনে হল চারিদিক থেকে আসা এলোমেলো হাওয়ারা দুরন্ত, আর মরা রোদেরা তেজ বাড়াচ্ছে প্রতিদিন একটু একটু করে, চোখ পুড়ে যাচ্ছে আমাদের সকলের। চারিপাশের হরেক রঙেরা একটু একটু করে ঝাপসা হয়ে, সাদা-কালো রঙ নিচ্ছে। এই নতুন দুনিয়াতে সহজেই ক্লান্ত, অবসাদগ্রস্থ হয়ে ওঠা স্বাভাবিক। কিন্তু এসব গ্রামের সবজে রঙের টলটলে পুকুর, আর ধানক্ষেতের স্পর্শ মাখা পাগলাটে কিছু হাওয়া, আর মাটির দালান আমাদের আশ্রয় হতে পারে। একটু চোখ বুজে নিঃশ্বাস নিয়ে দেখো, আধপোড়া চোখেও একটু অন্যরকম স্বপ্ন খুঁজে পাবে। তবে অনুভূতিটুকু রোদের তেজে শুকিয়ে গেলে বলতে পারবো না কি হবে! বিশ্বাস করো এখনো রাস্তা হারাইনি আমরা, এখনো স্বপ্ন দেখা যায় দুনিয়া বদলের, দশ দিনের না হলেও মাটি আঁকড়ে দশ বছর সময় দিলে এই বিকট পরিস্থিতিটা বদলাবে। প্রতিটা গ্রাম-মফস্বলের অভিজ্ঞতা আমাদের সেই শিক্ষাই দিচ্ছে, চলো গ্রামকে নতুনভাবে জানি, দেখি, বুঝি। নাসিক থেকে বোম্বে শহররের দিকে একটা মিছিল এগিয়ে চলছে। ঋণের দায়ে আত্মহত্যা করা দশ হাজার কৃষকের মৃত্যুর প্রশ্ন নিয়ে পঞ্চাশ হাজার মানুষ শহরের একটা গোটা উড়ালপুল স্তব্ধ করে দিয়েছে। খেলাটা চলবে, আমরা জিতবো, যদি একসাথে বেঁচে থাকার লড়াই, অধিকার ছিনিয়ে নেবার লড়াইটা দেওয়া যায়। বিকল্প সাংস্কৃতিক পরিসর গড়ে তোলাও সমান জরুরী এই অসম লড়াইয়ে।
রিপোর্ট – লাবনী
ছবি – কুনাল ও লাবনী
লিটল সিনেমার পক্ষ থেকে কুনাল, শুভাশিস, জাহাঙ্গীর ও লাবনী এই দু’দিনের উৎসব পরিচালনা করেন।