কাশ্মীর, এখন ও তখন

অনিন্দ্য দত্ত

“তারিফ করু ক্যায়া উসকি, জিসনে তুমহে বনায়া”। রবিবার রাতে পিপল্‌স ফিল্ম কালেকটিভ-এর মাসিক ফিল্ম স্ক্রিনিং অনুষ্ঠান থেকে বাড়ি ফেরার পথে কেন জানি না মাথায় গুন গুন করছিল ‘কাশ্মীর কি কলি’র এই গানটি। তার কিছুক্ষণ আগে সঞ্জয় কাকের তৈরি ‘জশ্‌ন-এ-আজাদি’ ছবির প্রদর্শনী ছিল। ছবি দেখানোর আগে এদিনের বক্তা কস্তুরী বসু গত এক দশক অর্থাৎ ২০০৮-২০১৮ সালের কাশ্মীরের পরিস্থিতি নিয়ে একটি অডিও-ভিস্যুয়াল উপস্থাপনা রাখেন। এই অনুষ্ঠান থেকেই ফিরছিলাম।

 

চেনা পরিচিত বা বন্ধুবান্ধবদের কাছ থেকে প্রায়ই প্রশ্ন শুনি, “কাশ্মীর বেড়াতে গেছ? না হলে দারুণ মিস করেছ!” দুঃখের বিষয় আমার যাওয়া হয়ে ওঠেনি। গতকাল সেই আফশোস যেন অনেকটাই মিটে গেল। উপস্থাপক যখন একের পর এক স্লাইড আর ভিডিও ক্লিপ বা চলচ্চিত্রের ক্লিপিং তুলে তুলে দেখাচ্ছিলেন অনেকগুলি দশক ধরে কাশ্মীরে চলা অঘোষিত যুদ্ধের খতিয়ান। পর্দায় মৃত কিশোরদের মুখগুলো একের পর এক ভেসে উঠছিল। তখন চোয়াল চেপে একটাই প্রশ্ন মাথার মধ্যে হাতুড়ির ঘা দিয়ে চলছে, “কি হচ্ছে এটা? এটা কি ফাজলামি?” পেলেট গানে ক্ষতবিক্ষত কিশোর কিশোরীদের মুখ, এর জন্যে দায়ী কে? আমরা কি এর দায় এড়িয়ে যেতে পারি? তাই তারিফ যদি করতেই হয়, তবে তারিফ করছি সেই শত শত শহীদদের, যারা জীবনের পরোয়া না করে, যৌবনের পরোয়া না করে, এক অনির্দিষ্ট কিন্তু কাঙ্ক্ষিত ভবিষ্যতের স্বপ্ন নিয়ে একের পর এক মৃত্যু বরণ করেছে।

 

অনুষ্ঠানের প্রস্তুতি শুরু হয় গত মাস থেকেই। সোশ্যাল মিডিয়ায় এবং পোস্টারের মাধ্যমে শহরে ছড়িয়ে পড়েছিল এই তথ্যচিত্র প্রদর্শনীর খবর। দর্শকে ভরা প্রেক্ষাগৃহ এক নতুন আশা জাগায়, যে কাশ্মীর থেকে বহুদূরে এই কলকাতায় অনেক মানুষ আছেন, যারা জানতে চান কাশ্মীরে আসলে হচ্ছেটা কি।

 

উপস্থাপনা থেকে জানছিলাম কাশ্মীর উপত্যকার বদলাতে থাকা পরিস্থিতিতে, এবং উপত্যকার মানুষের কথা ক্রমাগত বাইরে আসতে থাকায়, এমনকি মেইনস্ট্রিম বলিউড সিনেমাতেও কিভাবে পাল্টাতে বাধ্য হয় ন্যারেটিভ এবং দৃশ্যপট। সে আর ‘কাশ্মীর কি কলি’র মত নির্বিকার সুন্দর দৃশ্যপট দেখাতে পারে না, সামান্যতম সিনেম্যাটিক রিয়েলিসম-এর দায়ে সে এখন রক্তাক্ত। এই রক্তক্ষরণকে আর দূরে সরিয়ে রাখা সম্ভব নয়। ‘ভূস্বর্গ’ কাশ্মীরে কেবলই বিদেশি রাষ্ট্রের সাহায্যে কতিপয় বিচ্ছিন্নতাবাদী সন্ত্রাস সৃষ্টি করে চলেছে, এই জোলো ধারণাকে আম জনতার মস্তিষ্কে বপন করা আর সম্ভব হচ্ছে না। কাশ্মীরের সাধারণ মানুষের নাছোড় লড়াই ক্রমশ এটা স্পষ্ট করে দিচ্ছে, যে কাশ্মীরের কোনো ঘটনাই আর বিচ্ছিন্ন নয়।

 

উপস্থাপনায় ছিল গত পাঁচ/ছয় দশকের মেইনস্ট্রিম সিনেমার বাছাই করা ক্লিপগুলি। ‘কাশ্মীর কি কলি’র কাশ্মীরি মেয়ের ভূমিকায় শর্মিলা ঠাকুর কত সুন্দর ও হাসিখুশি এবং ভারতীয় যুবকের প্রেমে ব্যাকুল। কিন্তু, সেই সময়েই ১৯৬৪-তে কাশ্মীরকে কেন্দ্র করে ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধ চলছে। সিনেমায় তার লেশটুকু নেই। এই ভাবেই নির্মিত হতে থাকে আমাদের মনন, যে সবসময় মুখ ফিরিয়ে রাখে এক চরম এবং অপ্রীতিকর সত্য থেকে, আর মনে মনে জপ করে যায়, মেরা ভারত মহান।

 

‘রোজা’ সিনেমার একটি ক্লিপ দেখলাম। ছবিটা তৈরি হয়েছিলো ১৯৯২ সালে। সময়টি খুব গুরুত্বপূর্ণ। কাশ্মীরে তখন আত্মনির্ধারণের জন্য সশস্ত্র লড়াই-এর পর্ব শুরু হয়ে গিয়েছে। ৭০,০০০ সেনা মোতায়েন করে সেই সশস্ত্র লড়াইকে প্রায় দমন করাও হয়ে গিয়েছে। অতএব ‘রোজা’ সিনেমায় তার প্রক্ষেপণ হল বিদেশি রাষ্ট্রের মদতে কিছু মগজধোলাই হওয়া বিচ্ছিন্নতাকামী জনবিচ্ছিন্ন সন্ত্রাসবাদী। তাদের নিজস্ব কোনও মননই নেই যেন। কিন্তু তবুও কোনও ভাবেই ভূস্বর্গ কাশ্মীরকে নিয়ে রোম্যান্টিসাইজ করা গেল না।

 

এর বাইশ বছর পরের ছবি ‘হায়দর’। বিশাল ভরদ্বাজের তৈরি। ভারতের ন্যারেটিভ শেষ কথা বললেও যেখানে অন্ততপক্ষে সরাসরি আর্মড ফোর্সেস স্পেশাল পাওয়ারস অ্যাক্ট বা “আফস্পা” (AFSPA)-কে সমালোচনা করা হচ্ছে। কাশ্মীরের হর দিনের অপমান ও যন্ত্রণার ছবি উঠে আসছে। মেইনস্ট্রিম সিনেমায় এতটা পরিবর্তন শুধু শুধু হয় নি। কাশ্মীরের সাধারণ মানুষ, বৃদ্ধ বৃদ্ধা, ছাত্র ছাত্রী, মহিলারা সবাই রাস্তায় নেমেছেন সেনাবাহিনীর মাধ্যমে ভারত রাষ্ট্রের দমন পীড়নের বিরুদ্ধে। একদিন দু’দিন নয়, দিনের পর দিন, বছরের পর বছর তারা লাখে লাখে জমায়েত, মিছিল করেছেন সারা পৃথিবীকে জানাতে যে কাশ্মীরিদের আত্মনির্ধারণের অধিকার তো বটেই প্রতি দিনের নাগরিক অধিকার, বেঁচে থাকার অধিকারটুকুও ক্ষুণ্ণ হচ্ছে। উপস্থাপনায় বিশদে উঠে এল ১৪ই জুন ২০১৮-য় প্রকাশিত কাশ্মীরে মানবাধিকার হনন নিয়ে জাতিসংঘের দীর্ঘ রিপোর্টের কথা।

 

উপস্থাপনার পরে পরেই পর্দায় ভেসে ওঠেন পরিচালক সঞ্জয় কাক। দুঃখপ্রকাশ করেন উপস্থিত না থাকতে পারার জন্য, এবং ধন্যবাদ জানান দর্শকদের এই সুদূর কলকাতায় তাঁর তৈরি তথ্যচিত্রটি দেখতে জমায়েত হওয়ার জন্য, কাশ্মীর পরিস্থিতি নিয়ে কথা বলার জন্য।

 

 

শুরু হয় তথ্যচিত্র ‘জশ্‌ন-এ-আজাদি’। শুরুতেই ধাক্কা। ফ্রেমের মাঝখান দিয়ে কাঁটা তার যেন দৃষ্টিকে আটকে দিল। তার সাথে আজাদীর শ্লোগান, গোলাগুলির ধোঁয়ায় ঢাকা রাস্তা, কিন্তু কিছুতেই আর কাঁটা তারের বেড়া টপকানো যাচ্ছে না। আস্তে আস্তে কাঁটা তার পেরিয়ে ক্যামেরা প্রবেশ করলো এক বধ্যভূমিতে। বরফের চাদর ঢাকা সারি সারি কবর। আর তার মাঝে ঈদের দিনে বৃদ্ধ পিতা খুঁজে চলেছে পুত্র কোথায় শায়িত রয়েছে। অনেকদিন পরে তো! কবরের সংখ্যাও গেছে বেড়ে। তারই ক’দিন পরে শ্রীনগরের লাল চকে উদ্‌যাপিত হচ্ছে ভারতের স্বাধীনতা দিবস। খাঁ খাঁ ফাঁকা রাস্তায় কারফিউ। কাকপক্ষীর দেখা নেই। তার মাঝে সেনাবাহিনীর আড়ষ্ট গান স্যালুট। এই ভাবে ক্যামেরায় সওয়ার হয়ে আমরা ঘুরতে থাকি উত্তর থেকে দক্ষিণ, পূর্ব থেকে পশ্চিম। পৌঁছে যেতে থাকি একের পর এক গ্রামাঞ্চলে। কৃষকদের জীবনে। দেখতে থাকি পুত্র হারা মায়ের কান্না, আবার কখনো বা বাঘিনীর মত ফুঁসে উঠে মা ঘোষণা করে দেন, সরকারের কোনও সাহায্যের আমার প্রয়োজন নেই। তাঁর একমাত্র চাহিদা হল আজাদি। তার সাথে সাথে ক্যামেরা দেখিয়ে দেয় পর্যটকদের ছেনালিপনা। কাশ্মীরের মানুষদের নিয়ে অবজ্ঞা, অজ্ঞতা আর জাতীয়তাবাদী দম্ভ দিয়ে তা মুড়ে রাখার অর্থহীন প্রচেষ্টা। রক্তাক্ত বধ্যভূমি যখন সাদা বরফে ঢেকে যায়, তার উপর দিয়ে গড়িয়ে নামে ভারতীয় পর্যটকের ক্লেদ, হাসতে হাসতে, শিশু সুলভ অজ্ঞানতায়।

 

প্রায় দু’ঘণ্টার উপর এই তথ্যচিত্রে সঞ্জয় শুধু মৃত্যুমিছিল বা ধ্বংস দেখাননি, তিনি সামরিক বাহিনীর ‘কনফিডেন্স বিল্ডিং’ করার জন্য করা কাজগুলো তুলে দেখিয়েছেন। দেখিয়েছেন সেই পরিহাস। দেখিয়েছেন এই সময়ে কাশ্মীরি পণ্ডিতদের দেশত্যাগের মর্মান্তিক অধ্যায়। সমাজের বুনোটে তৈরি হওয়া ফাঁকা একটা গর্তের মত সংখ্যালঘুদের অনুপস্থিতি ফুটিয়ে তুলেছেন অসাধারণ দক্ষতায় – বার বার কেটে যাওয়া ফোন কল, ছিন্ন যোগাযোগ, বিষাদময় কবিতার ছত্রে। আন্দোলনের মধ্যেকার জটিলতাও ধরা দিয়েছে ন্যারেটিভে। কোনো কিছুকেই এড়িয়ে না গিয়ে এক জটিল কার্পেটের মতো কাশ্মীরের প্রতিদিনের বাস্তবতাকে পর্দায় তুলে ধরেছেন সঞ্জয়। কার্নিভালের মেজাজে এসেছে খোলা আসমানের নিচে যূথবদ্ধ মানুষের মাঝে গ্রামীণ থিয়েটার দলের ফুটিয়ে তোলা সাধারণ কৃষক বনাম অত্যাচারি শাসকের পালার মঞ্চায়ন। কিন্তু শেষপর্যন্ত, ক্যামেরা আসলে খুঁজে পায় ধিকি ধিকি করে জ্বলতে থাকা স্বজন হারানোর ক্ষোভ, আর এই সব কিছুর মধ্যে নিরন্তর বয়ে চলা কাশ্মীরীদের আজাদির চাহিদা আর তার জন্য দীর্ঘসময়ের যাত্রার প্রস্তুতি।

 

ঘরে ফিরি এক স্বপ্ন দেখতে দেখতে। কোনওদিন হয়ত তাঁদের সম্মতি নিয়ে কাশ্মীর যাব। স্বাধীন মানুষের কাশ্মীর দেখতে।

 

ছবি – অনিরুদ্ধ দে

উৎসাহী দর্শকরা দু’ভাগে জশ্‌ন-এ-আজাদি ছবিটি দেখতে পারেন এইখানেঃ

 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *