জোহরা, সিসিলিয়া, কমলাদের কথা

অন্ধকারের আলপথ ভেঙে শত শত পা ধাবমান, যান্ত্রিক দানবেরা নিজেদের সময় মতো চলে যে! সময় ৪:৪০। কুয়াশার বুক চিড়ে ট্রেনটা এগোতে থাকে সূর্যের দিকে; শহরের গাছে কাকেদের ঘুম ভেঙেছে তখন সবে। আরেকটা শহরের দিন তৈরি করতে ‘শহরের কারিগরেরা’ ঢুকতে থাকে সেই যন্ত্রের পেটে। বীভৎস কোলাহলে, ট্রেনের নিজস্ব দুর্গন্ধের মধ্যে, ভ্যাপসা গরম বাড়তে থাকে। বাসি-মুখে, ফোলা-চোখেরা ইতিউতি তাকাতে থাকে পরিচিত মুখের খোঁজে। মিলে গেলে সেই জটলাতে টিফিন বাক্সগুলো খোলা হয়, সেলিমের কাছে মুড়ি-ঘুগনি, বা নয়নের কাছে পাউরুটি-কলা কেনা হয়, হিসেব খাতায় লেখা থাকে। হাসি-ঠাট্টা-খিস্তি-ঝগড়া মিলে-মিশে ট্রেনের মধ্যে একটা স্বতন্ত্র পৃথিবী গড়ে ওঠে। গড়িয়া ষ্টেশন থেকে বদলাতে থাকে ‘যান্ত্রিক দানবের’ পেট, যা ক্রমশ খালি হতে থাকে, আর ভরে উঠতে থাকে ‘দৈত্যের শহর’। মাটির সোঁদা সুবাস নিয়ে শুরু হয় এই ‘দৈত্য শহরের’ নতুন দিন।
আপনারা এই আলপথের মাটিলাগা পায়ের মিছিল দেখবেন? সকাল ছ’টায় যাদবপুর ষ্টেশনের বাইরে নাইনবি দূরত্ব পেরিয়ে এইটবি পর্যন্ত প্রসারিত অসংখ্য মেয়ে এগিয়ে চলছে সূর্যের সাথে। একটু একটু করে আলো উঠছে আপনাদের শহরে। আর আটপৌরে কাপড়ের মানুষগুলো পুড়ে যাচ্ছে, প্রখর তাপের সাথে। ইস্পাত! ইস্পাত! শ্রমিকের হাতের মতোই কঠিন হয়ে ওঠে কিশোরী হাত একসময়ে। তবে আপনাদের ভাষাতে সে ‘কাজের মেয়ে/কাজের মাসি’ (যেমন ঘরের মা, ঘরের মেয়ের, ঘরের পিসীমার কাজ যেমন না-উৎপাদন (না-অর্থনৈতিক) অনেকটা তেমনই)। যাদের শ্রমিকের স্বীকৃতি, আর কাজের সম্মান কোনটাই গড়ে ওঠে না। না, উঠতে দেওয়া হয় না। যাদের উপার্জনও অনির্দিষ্ট। ফাউ।
আপনাদের তিলোত্তমা নগরীতে সেই কিশোরী, যুবতী, আর ভোরের মিছিলের সেই নারী শ্রমিকদের নিয়ে আবার করে প্রশ্ন তোলার মধ্য দিয়ে ১১ই নভেম্বর শনিবার পিপল্‌স ফিল্ম কালেক্টিভের পক্ষ থেকে নেওয়া হয় একটি অনুষ্ঠানের উদ্যোগ। ‘হামারে ঘর’ ও ‘সিসিলিয়া’ দু’টি ছবির স্ক্রিনিং সহ কিছু কথা হল সারা দেশ সহ রাজ্যের এই মহিলা শ্রমিকদের কর্মস্থল, অধিকার, আইন, কীভাবে কতোটা অবাঞ্ছিত অবহেলিত উচ্চ/মধ্যবিত্তের জীবনে, একাডেমিক চর্চায়।
সভার শুরুতে বক্তা উল্লেখ করেন দেশের এই বিশাল পরিমাণ অসংগঠিত ক্ষেত্রের নারী শ্রমিকের উপর শোষণের মাত্রা সর্বাধিক। আগে যেমন এই অসংগঠিত গৃহশ্রমিকেরা নিজেরা কাজের সন্ধানে বা দালাল মারফৎ জীবিকা খুঁজে পেতেন, বর্তমানে বেশ কিছু শহরে এজেন্সি/সেন্টার গৃহশ্রমিকদের নিয়োগের জন্য তৈরি হচ্ছে; আর নিয়ন্ত্রণের নতুন নতুন রূপের হিংসা আরও গাঢ় হচ্ছে ক্রমাগত এই গৃহশ্রমিকদের জীবনে। আইন কি করতে পারে, আইনকারকদের অধিকাংশের মাথাতে যখন রাজনীতি, মধ্যবিত্ত ভোটব্যাংক কাজ করে তখন আবছা হয়ে ওঠে শ্রমিক তথা ‘প্রান্তিক শ্রমিকের’ অধিকারের সপক্ষে কথা বলা নতুন আইন, আইনি সংস্করণ। আর পশ্চিমবঙ্গের কথা যদি দেখা হয়, নব দত্ত জানান, বর্তমানে যে ১১টি রাজ্যে অসংগঠিত কর্মীদের মধ্যে গৃহশ্রমিকদের স্বীকৃতি দিয়ে তাঁদের জন্য আলাদা প্রকল্প ও বিল এনে ন্যূনতম মজুরি, সামাজিক সুরক্ষা, ন্যূনতম হলেও কিছু শ্রম-অধিকার নির্দিষ্ট করা হয়েছে। সেখানে পশ্চিমবঙ্গে এ যাবৎ এনাদেরকে অসংগঠিত ক্ষেত্রের শ্রমিকের মধ্যে সাফস্‌পাউ এর মত কিছু সাধারণ প্রকল্প ছাড়া আলাদা করে একটি শ্রমিক সেক্টর হিসেবে স্বীকৃতই করা হয় নি। তাঁদের জন্য কোনও শ্রম-বিল আসেনি। তাঁদের পরিস্থিতি অনুযায়ী তাদের দাবি মেনে কোনও সামাজিক সুরক্ষা প্রকল্প আসেনি। বহু দিন পর্যন্ত শ্রমিক আন্দোলনের মধ্যেই চরম উদাসীনতা কাজ করেছে গৃহশ্রমিকদের সংগঠিত করা নিয়ে। যার ফলে এখনো পর্যন্ত গৃহশ্রমিকদের সংগঠিত শক্তি অত্যন্ত ক্ষীণ, দুর্বল, বিচ্ছিন্ন, বিক্ষিপ্ত অবস্থায় পড়ে রয়েছে। আর এ রাজ্যে সরকারিভাবে তাঁদের কাজভিত্তিক ও ঘন্টাভিত্তিক ন্যূনতম মজুরি নির্ধারণ তো আজও করা হয় নি। বামপন্থী সংগঠনগুলির শ্রমিক ইউনিয়নগুলিও কি পরিমাণ উদাসীনতা দেখিয়ে থাকে এই শ্রমিকদের অধিকার আন্দোলনের প্রশ্নে। এর একটা বড় উত্তর হল মধ্যবিত্তের সাথে এই শ্রমিকদের অবধারিত সরাসরি স্বার্থের সংঘাত, তবে এ ছাড়াও আরও আনুষঙ্গিক বিষয় জড়িয়ে আছে বলে মনে করা হয়।
পশ্চিমবঙ্গের গৃহশ্রমিকের প্রসঙ্গে আমরা আরও জানতে পারি, আমাদের বাবুদের শহরে এই শ্রমিকদের মধ্যে করা সমীক্ষায় একটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য দেখা যায়, দেখা যায় শ্রমিকেরা অধিকাংশই গ্রামবাংলার হিন্দু, দলিত-আদিবাসী বর্গের ‘হিন্দু’। মুসলিমদের সংখ্যা সমীক্ষায় কম। তার একটি কারণ, তাঁরা সহজে রান্না ও ঘরের কাজের ক্ষেত্রে এই শহরে গ্রহণযোগ্য নন। যদিবা তাঁরা কাজ করেন, তাঁদের অনেককেই নাম বদলে হিন্দু নামে আসতে হয়। দ্বিতীয় কারণ, মুসলিম গৃহশ্রমিকদের ক্ষেত্রে সচরাচর দেখা যায় যে মুসলিম-প্রধান এলাকা বা বসতিতেই কর্মসংস্থান হচ্ছে। বর্ণহিন্দু-প্রধান এলাকায় তাঁদের কর্মসংস্থান খুব কম হচ্ছে।
আমাদের এই বাঙালি সভ্য বাবু ও তাঁদের ‘দৈত্য শহরের’ নানা কথা আর প্রতিদিন ভোরে জীবিকা অন্বেষণের ওই মিছিলের নারীরা বেশ আবছা। আরও অনেকভাবে উঠে আসুক ‘আমাদের ঘরের’ (‘হামারে ঘর’-এর) দ্বিচারিতা। কিশলয়ের ছবি ‘হামারে ঘর’ যেন অবলীলায় টেনে সরিয়ে দিতে পারে আমাদের মুখের মুখোশগুলো। আমাদের সিম্প্যাথির মধ্যে যেভাবে মিশে থাকে মালিকের ক্ষমতার অনুগ্রহ। ছবির দু’টি দৃশ্য সব থেকে বেশি ধাক্কা দেয়।
-“দিদি পিহুর স্কুলে মাইনে দিতে হবে, মাসের ১৫ তারিখ হয়ে গেলো…”।
মালকিন আদর করে অনুগ্রহ করে ৫০ টাকা ধরিয়ে দেন। কমলা ডাইরিতে দিন-তারিখ-সময় দিয়ে টাকার পরিমাণ যেখানে লেখে সেখানে আগের মাসেও একইভাবে ১০, ২০, ৫০, ১০০, ২০০ টুকরো অনুগ্রহ, দেরি করে ছুঁড়ে দেওয়া মাইনের তারিখ ও সময় সহ হিসেবের ফর্দ।
কমলাদের ডায়েরি কবে পড়া হবে? বেবি হালদার, আলপনা মন্ডলরা কিন্তু ডায়েরির বাইরে বেরিয়েও জীবনবৃত্তান্ত লিখছেন। সমাজ কি পড়ছে কমলাদের ডায়েরি?
আর একটি কথোপকথনে মালকিন বলছেন,
-“তোমাদের হাতের গুণ বটে কমলা, কাকাও ঠিক এভাবেই চা বানাতো”।
কমলা উত্তরে বলছে
-“আমি কোনোদিনও বাবাকে রান্না করতে দেখিনি”।
মালকিন বলছেন
-“তোমার তো বিয়ে হয়ে যাবে। পিহুকে তুমি ঠিক এমনি করেই চা বানাতে শিখিয়ে দিও। আমি খারাপ চা একদম খেতে পারবো না”।
মালকিনের বাড়ির পোষা মাছ ঘুরপাক খায় এক ছোটো জলের জারে। তবু মাছ ক্লান্ত হয় না। কারণ প্রতি তিন সেকেন্ড অন্তর মাছ ভুলে যায় সমস্ত পূর্বস্মৃতি। মাছের কোনও তেতো স্মৃতি নেই। কিন্তু কমলা তো মাছ নয়। তো এক ভোরে মালকিনের সুললিত মোড়কের অদৃশ্য ‘ভায়োলেন্স’, অসম্মান আর অনুগ্রহের জবাবে ইন-হিউম্যান, ‘bitch’ কমলা তার বোনকে নিয়ে বাড়ি ছাড়ে, মালকিনের ব্যাগ থেকে নিজের শ্রমের উপার্জন ১৫০০ টাকা নিয়ে। বোনকে দেওয়া সিম্প্যাথি/ক্যাডবেরি-টা রেখে যায় মালকিনের মানিব্যাগে।
পরের ছবি ‘সিসিলিয়া’র মালিক এম্প্যাথেটিকালি যুক্ত হয়ে উঠছেন বাড়ির পরিচারিকা সিসিলিয়ার সাথে। চাইল্ড ট্র্যাফিকিং –শিশুপাচার এর শিকার পরিযায়ী কাজ করতে আসা সিসিলিয়া হাঁসদার নাবালিকা মেয়ের মৃত্যুরহস্য জানার চেষ্টায় সিসিলিয়ার লড়াইয়ে তারা সামিল হয় ঠিকই। নোবেলজয়ী কৈলাস সত্যার্থী পর্যন্ত সাহায্যের জন্য তারা পৌঁছলেও, তিনি তার অসীম প্রতিপত্তি আর বিরাট অফিস/কর্মীবাহিনী নিয়েও অনেক প্রতিশ্রুতি দিয়ে সামান্যতম কাজের-কাজ-হওয়া সাহায্য করতে সক্ষম হননি। ছবির একটি দৃশ্যে আমরা দেখি সত্যার্থী নোবেল পুরস্কার পাওয়ার পর শিশুশ্রম ও শিশুপাচার নিয়ে টেলিভিশনে ভাষণ দিচ্ছেন। সিসিলিয়া বসে সেই ভাষণ শুনছেন। সিসিলিয়ার উপর চাপ তৈরি হয় এমনভাবে যে তাঁকে বহু দিন ধরে লড়াই করার পরও অর্থের বিনিময়ে মীমাংসার পথে হাঁটতে হয়। সম্পূর্ণ ভাবে পার পেয়ে যায় দিল্লীর বড়লোক পাড়ার সেই মালিকরা যাদের বাড়িতে কাজ করতে এসে সিসিলিয়ার নাবালিকা কন্যা প্রাণ হারায়! এই ক্রেতা-কেন্দ্রিক দৈত্য-সভ্যতায় ক্রেতার প্রকৃত প্রস্তাবেই সাত খুন মাফ! আর গ্রামে হিউম্যান ট্র্যাফিকিং-এ যারা যুক্ত সেই দালালচক্র-সাপ্লায়ারদের বিরুদ্ধেও সিসিলিয়াকে শেষ পর্যন্ত কেস তুলে নিয়ে বাধ্য করা হয়। এবং সমগ্র গ্রামসভাতে সিসিলিয়াকে ক্ষমা প্রার্থনা করতে হয় গ্রামের মোড়লদের কাছে; কারণ তিনি নিজের সন্তানের মৃত্যু রহস্য জানবার জন্য আইনব্যবস্থার দ্বারস্থ হয়েছিলেন। গ্রামের মোড়লরা সিসিলিয়ার ‘অপরাধ’ মার্জনা করে দেয়। আর পরের দিন তাঁর মৃত মেয়ের জন্য প্রার্থনা করে।
সিসিলিয়ার বাড়ির মালিকরা অনুভবী হওয়া সত্ত্বেও তাদের অনুভবের সীমা নির্ধারিত। সিনেমাটির শেষের মুহূর্তে তাঁর গ্রামে তাঁর অবস্থাতে তাঁকে রেখে এসে স্বীকার করে নেন ‘সিসিলিয়ার পৃথিবী আমার নয়’।
এই সময়ের প্রেক্ষিতে নয়ডার জোহরা বিবির পৃথিবীর সাথেও একই কথা বলা যায়। তাঁর পৃথিবীতে শ্রেণী-চেতনার অংশ থেকে সেই ভোরে মহাগুণ মডার্ণ সোসাইটির দৈত্য-প্রাসাদে যে প্রতিরোধ গড়ে উঠেছিল তাকে দমন করতে উচ্চবর্গের সাথে হাত মেলায় প্রশাসন। ওই সময়ে যারা জোহরা বিবিদের লড়াইয়ের পাশে দাঁড়িয়ে ছিল এক সময়ে তারা ফিরে আসে, তারা ফিরে আসবে তাদের নিরাপদ আশ্রয়ে। এখনো ২৯ জন জেলে আছেন। মহাগুণের দৈত্য-প্রাসাদের সামনের টিনের চালের বস্তিতে রোলার চালিয়ে গুঁড়িয়ে দিয়েছে রাষ্ট্র। ওই দিনের শ্রেণী-যুদ্ধের সাময়িক ইতি। আমরা এম্প্যাথেটিক হয়েও অসহায়, কারণ আমাদের দুনিয়া কমলা, সিসিলিয়া, জোহরা সকলের পৃথিবীর থেকে আজও পৃথক। তাই সাম্প্রদায়িকতা নিয়ে বাবু সমাজের সামান্য চিন্তাভাবনা কপাল কুঁচকালেও, শ্রেণীযুদ্ধ নিয়ে এখন আর ভাববার অবকাশ তেমন নেই। তাই স্ক্রিনিং চলাকালীন সঞ্চালক বলতে বাধ্য হয়, ‘অন্য ইস্যুতে অন্যদিনের অনুষ্ঠানে হল ভর্তি হয়ে যায় অথচ শ্রমিক ইস্যু এলেই মুক্তাঙ্গনের প্রেক্ষাগৃহের অর্ধেক খালি থাকা আসলে আমাদের বাবুসংস্কৃতির উদাসীনতার অন্যতম একটি লক্ষণ’।
কিন্তু ভেবে দেখুন ৪:৪০-এর ট্রেনভর্তি মেয়েগুলো যদি কোনও এক ভোরে সত্যি একটা অধিকারের মিছিলে নামে? সূর্যের চোখে চোখ রেখে? আপনার পক্ষ কি হবে? মালিকের দিকে, না শ্রমজীবী মানুষের অধিকারের লড়াই-এর সপক্ষে?
লাবনী জঙ্গী
ছবি- কুনাল চক্রবর্তী।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *